‘স্বাধীনতা খুঁজি’

কবি-লেখক,সম্পাদক ও সাংবাদিক -তাহেরা আক্তার,গাজীপুর সদর

প্রথমেই শুরু করছি প্রাণবন্ত বাচ্যার্থ পঙক্তি দিয়ে-‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও লাখাে জনতার জীবনদানের এক রক্তিম ইতিহাস এই স্বাধীনতা সংগ্রাম।মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে এক সােনালি অধ্যায় এটি যা প্রত্যেকটি বাঙালির হৃদয়ে গাঁথা। স্বাধীনতার এ অধ্যায় বড় সুউজ্জ্বল উজ্জীবিত,অত্যন্ত বেদনা ও আনন্দের মুখরিত এক অধ্যায়।মুক্তিযুদ্ধ থেকেই বাঙালি সত্তায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চেতনা জন্ম নেয়।জন্ম নেয় স্বাধীন হবার এক অনিপুণ চেতনা।তবে স্বাধীনতার চার দশক পরেও সার্বভৌমত্ব রক্ষা,অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক আযাদির জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে আমাদের।মনে রাখতে হবে,যেমন দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য দলমত ও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে নতুন করে শপথ নিতে হবে ঠিক তেমনি এই লক্ষ্যে কাজ ও করে যেতে হবে। ততকালীন ইংরেজ শাসকদের অবসানের মধ্য দিয়েই পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলেও পাকিস্তানি শাসকগণ পরিণত হয় বিশাক্ত শােষকে।তাদের বৈষম্যমূলক আচরণ আর শােষণ নিষ্পেষণের যাঁতাকলেই নিপতিত হয়ে পিষ্ট হয় বাংলার সাধারণ মানুষ। অত্যাচারের মাত্রা বেশি হলে আন্দোলনে গর্জে ওঠে বাংলার কামার,কুমার,চাষি আর দামাল ছেলে গুলো।কালে কালে তা রূপ নেয় ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নামে।অবশেষে দীর্ঘ নয়টি মাস সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের পর উদিত হয় স্বাধীন বাংলার নবীন সূর্য।আর আমরা শতো প্রাণ ত্যাগ আর তিতিক্ষার পর পায় স্বাধীনতার শুভ্র ঘ্রাণ।

স্মরণাতীতকাল থেকেই বাংলাদেশ ছিল পরাধীন রাষ্ট্র এবং বাঙালিরা ছিল শােষণ-বঞ্চনার প্রধান শিকার তথা নির্যাতনের একমাত্র হাতিয়ার! প্রায় দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় পাকিস্তান রাষ্ট্র।কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের একরেখা শাসন-নীতির ফলে বাঙালিরা ছিল বেশ শােষিত।আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকেও তারা স্বীকৃতি দেয়নি; দেয়নি নিজ মাতৃ ভাষায় কথা বলার অধিকার! যার ফলে ১৯৫২ সালে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনে তীব্র হয়ে ওঠে বাংলার মাঠ,ঘাট জনপদ।মাতৃ ভাষা বাংলা চাই এই স্লোগানে গর্জে উঠে গোটা দ্বীখন্ডিত দেশ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাংলা ভাষা- ভাষিরা।বাঙালির এই স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র
মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে আটক করলে জনগণের তীব্রতার বাঁধ ভাঙে যেনো! ফলে আন্দোলনের মুখোপতি হয়েই ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি নিশ্চিত করে একপ্রকার বাধ্য হয়ে।এখানেই বাঙালির সৌরচিৎকারের শেষ নয় বরং এটাই ছিলো শুরু!

গণআন্দোলনের মুখে জেনারেল আইয়ুব খানের পদত্যাগের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালে পুনরায় সামরিক শাসন জারি করেন।তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেই ঘােষণা করলেন,শীঘ্রই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সামরিক বাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।যা ছিলো এক বিকট সম্ভ্রম। ইয়াহিয়া খানের ঘােষণানুযায়ী ১৯৭০ সালের ১৭ই ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টিতেই প্রাদেশিক নীতি স্থগিত ঘােষণা করেন।আবার ৬২১ টি পরিষদের ৩৯০ টি আসনের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানের পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) আসন ছিলো ৮৮ টি আর আওয়ামী লীগের সদস্যরা ২৯৮ টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।

এদিকে ১লা মার্চে ইয়াহিয়া খানের ঘােষণায় পূর্ব পাকিস্তানের জনতারা
হতবাক হয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অসহযােগ আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়লে শুরু হয় বিপর্যয়! অসহযােগ আন্দোলন পরিচালনার জন্যই ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।সামরিক বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে হবে।জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এ আহ্বানের ফলে সকল অফিস- আদালত,কলকারখানা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সবকিছুই অসাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাধীনতার আন্দোলন চরম পন্থি রূপ নেয়।এর পর প্রতিহিংসায় শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ! আর শতো উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে জয় লাভ করে বাংলার সোনালী সেনারা।চট্টগ্রাম বেতারের গীতিকার,অধ্যাপক ও সাংবাদিক আবুল কাশেম সন্দ্বীপ বিগত ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সালে সন্ধ্যা ৭;৯ মিনিটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে’বঙ্গবন্ধুর ‘ডিক্লারেশন অব-ওয়ার অব ইন্ডিপেনডেন্টস’ এ স্বাধীনতার ঘােষণা পত্র দেন।

এই নয় মাসের যুদ্ধে পাকবাহিনীর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ে! আর কোনাে উপায় খুঁজে না পেয়ে পাক হানাদার বাহিনীরা ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর নিঃশর্তভাবে বাংলার মুক্তি সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
পাকিস্তানি শােষকদের শােষণ-বঞ্চনা ও ভেদ-বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করণে, সর্বোপরি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলাে স্বাধীনতার চার দশক পরও মুক্তিযুদ্ধের এ চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়নি ঠিক ভাবে! এখনাে এ দেশের মানুষ পথের ধারে ঘুমোয় বাসস্থানের অভাবে,এখনাে মানুষ মরে খাবারের সংকট অনাহারে! এখনাে মসজিদের ইমাম যিনি কিনা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত করতো সকাল সন্ধ্যার বাতাস,শিক্ষক যে কিনা দেশের সুউজ্জল ভবিষ্যৎ নির্বাচনের একমাত্র পাথেয়,সাংবাদিক যারা কিনা পূর্ব ইতিহাস সংস্কৃতির রক্ষক ধারক, বুদ্ধিজীবী যিনি পরম সমৌহনি ও রাজনৈতিক নেতা যাদের কিনা প্রায়ই গুম হতে শোনা যায়।হত্যা রাহাজানি আর রাজনৈতিক কলুষতা এখনো সোনার দেশে বিরাজমান।হীন স্বার্থের বাহুবলে মসজিদ-মন্দিরে অগ্নিসংযােগ করা হয় এখন! হয় প্রকাশ্যে ব্যভিচারের মতো ঘৃণ্য ও জঘন্যতম অপরাধ। মানবাধিকার লজ্জিত হয় কিছু পৌনপৌনিক বিশ্বাসঘাতকতার ফাদে পড়ে।গণতান্ত্রিক অধিকারও খর্ব হয় বহুলাংশে! এর জন্য দায়বদ্ধতা কার আমাদের না এই বাংলার?

ডাকাতি,ছিনতাই,ধর্ষণ,খাদ্যে ভেজালসহ সবধরনের অনাচার যেন এখন নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে
দাড়িয়েছে এই সোনার বাংলা দেশে।আর এসব কিছুই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থিত কাজ।এজন্যই বোধহয় কবি বলেছেন,“কী দেখার কথা
কী দেখছি,কী শােনার কথা কী শুনছি, তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি।”