তরুণদের চিন্তা ও মননে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থান তৈরির জন্য দরকার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান। বঙ্গবন্ধুর চর্চা। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে বা জানাতে   ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই তরুণদের মধ্যে লালিত হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর নীতি-নৈতিকতা। তৈরি হবে ঘরে ঘরে শেখ মুজিব। তবেই তরুণরা পথভ্রষ্ট হবে না। নীতি-নৈতিকতা ও নিজ দায়িত্বে এগিয়ে আসবে সমাজ ও দেশের কল্যাণে। তরুণরাই পারে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বুকে লালন করে সোনার বাংলা গড়তে যেখানে মা হাসবে আর শিশুরা খেলবে। বাংলা ও বাঙালির হূদয়ে অনন্তকাল  লালিত হোক  চিরঞ্জীব মুজিবের আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তার নির্দেশনায় উজ্জীবিত হোক তরুণরা। তরুণরা জেগে উঠুক জয় বাংলা স্লোগানে বঙ্গবন্ধুর নামে

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থাপতি, বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালির জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি অন্ততকাল বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙালির হূদয়ে। যার জন্মের মাধ্যমেই বাঙালি পেয়েছিল স্বাধীনতা। পেয়েছিল স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। শত বছর আগে যদি বাংলার বুকে শেখ মুজিবের জন্ম না হতো তাহলে হয়তো পরাধীনতার অন্ধকারেই থেকে যেতে হতো আমাদের। শেখ মুজিবের এমন অবিশ্বাস্য নেতৃত্ব ক্ষমতা, এমন দূরদর্শিতা যার অবদান এই বাংলার মানুষ কখনো শোধ করতে পারবে না।  সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারবো না। বাঙালির ভালোবাসার ঋণ বুকের রক্ত দিয়ে শোধ করবো ইনশাআল্লাহ। —বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর শুধু এই কথাটুকু দ্বারা আমরা এটা বুঝি, বাংলার মানুষকে তিনি অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তিনি বলেছেন ‘সাত কোটি ভালোবাসার কাঙাল আমি’ বাংলার মানুষকে বাংলার মাটিকে কতটা ভালোবাসলে একজন মানুষ অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এমন কথা বলতে পারে! কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মমমতা, যেই বাঙালির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর সময়গুলো পরিবারের সাথে না কাটিয়ে কাটিয়েছেন জেলে, মিটিং-মিছলে। সেই ঘাতক বাঙালির এক অংশের বুলেটে তার মৃত্যু হয়েছে। যা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রে কালিমালিপ্ত এক অধ্যায়ের নাম। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। যে দুঃখ ভোলার নয়। কালিমালিপ্ত নির্মম এই আগস্ট মাস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই বর্বরতা ও নৃশংস হত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। যা বাঙালি জাতির জন্য এক কালো অধ্যায়। তবুও ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে মুছতে পারেনি এই বাংলা থেকে। বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পৌঁছে গেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।

ইতিহাস সত্যের কথা বলে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কয়েকজনকে পাওয়া বিরল যারা তাদের কর্মকাণ্ডের দ্বারা দীর্ঘস্থায়ী আসন বেছে নিয়েছেন জনসাধারণের মনে। যার দীপ্ততায় উজ্জীবিত হয়ে তরুণরা আজও তাদের স্বপ্নগুলোকে লালন করছে। এমন ক্ষণজন্মা পুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে যাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে, সে দেশের মানুষের সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তারা পরাধীন দেশবাসীর জীবনে মুক্তি এনে দেন, দুর্যোগের ঘনঘটা দূর করে তাদের হাতে স্বাধীনতার সূর্য পতাকা উপহার দেন। আমাদের দেশের এরূপ একজন সংগ্রামী পুরুষের কথা আমাদের চেতনায় মিশে আছে, মিশে আছে আমাদের রক্ত কণিকায়। তার অবদান মিশে আছে বাংলার মাটির প্রতিটি কণায় কণায়। যার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠে তরুণরা। জেগে উঠে জয় বাংলা স্লোগানে সেই মহান পুরুষ বঙ্গবন্ধুর নামে।

তরুণদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিলো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, তার বাগ্মিতা, মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থহীন ভালোবাসা, সহজেই মানুষের সঙ্গে মেশা, সাহসিকতা প্রভৃতি গুণাবলি তার দিকে তরুণদের আকৃষ্ট করতে বাধ্য করে। ৭ মার্চের ভাষণ, তার আঙুলি হেলানো বজ্রকণ্ঠ, শব্দ চয়ন ভীষণ শিহরিত করে তরুণদের। তাই তো তরুণ প্রজন্ম ধারণ করতে চায় বঙ্গবন্ধুকে। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি ছিলেন আপসহীন ও সত্যের প্রতি অবিচল। বাল্যকাল থেকেই তিনি কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। শিশুকাল থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিবাদী। মানবতাবাদী এ মহান নেতা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি। তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু নিজেও বিশ্বাস করতেন তরুণরাই দেশের মূল চালিকাশক্তি। তিনি তরুণদের সংগ্রামের বাণী শিখাতেন, রাজনীতি ও সাহিত্যর প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন, অন্যায়ের কাছে আপসহীন হতে শিখিয়েছেন, শিক্ষা ও শিক্ষার আদর্শগুলো জীবনে ধারণ করতে বলেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু তারুণ্যের প্রতি বিশ্বাস এবং তার নিজের তরুণ জীবনের সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে তারুণ্যের চোখে বঙ্গবন্ধু কেমন সে বিষয়ে একটি জরিপ করা হয়। যাদের বয়স ১৫-৩০ এবং এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তারা মনে করেন ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং স্বদেশ স্বাধীন হয়েছিল। ৮১ শতাংশ মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সাম্যবাদী ভাবনা, উদার রাজনৈতিক দৃষ্টি, শোষণহীন সমাজ গড়ার চেতনা তরুণ সমাজকে প্রলুব্ধ করে। তার মানবিকতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতার কারণেই তিনি হতে পেরেছেন বাংলার তরুণদের স্বপ্ন সম্রাট।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বিশেষ করে তরুণদের প্রতি তার দৃষ্টি ছিলো কোমল। কারণ তিনি জানতেন, কেবল তরুণরাই তাদের সৃষ্টিশীল মেধা ও অল্প পুঁজি খাটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। অথচ বর্তমানে আমরা তরুণ হয়ে খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যাই। মাঝে মাঝে ভুল পথে হেঁটে চলি, ভুলে যাই আমাদের অতীতকে। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসলেও উদ্দীপ্ত এই তরুণরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে। মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও মমত্ববোধকে আমরা ভুলে যাই আর হয়ে উঠি স্বার্থন্বেষী। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়েও আমরা নীতিনৈতিকতাহীন কাজে লিপ্ত হই যা তরুণ প্রজন্মের করা অনুচিত। যা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পরিপন্থি। আমরা ভালোবাসবো বঙ্গবন্ধুকে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে পথ চলেছেন। দুর্গম পথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে একাই পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান তরুণদের মাঝে এক ধরনের বিচলিত ভাব লক্ষ করা যায়। অল্পতেই হতাশ ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। নিজ লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে আশা হারিয়ে ফেলে। তাই নিজেদেরকে উজ্জীবিত করতে, সাহসী হতে, আত্মবিশ্বাসী হতে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আদর্শিত হতে হবে। আর তাই বঙ্গবন্ধুকে জানা খুব বেশি প্রয়োজন।  তরুণসমাজকে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ও আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ২০১৪ সালে বিবিসির একটি জরিপে বঙ্গবন্ধু ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত হন। তার এ অবদান বাঙালি জাতি কখনো ভুলবে না। তাই তো আনন্দ সরকার রায় বলেছেন, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা,গৌরি মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ আসলেই তাই। যতকাল পদ্মা মেঘনা যমুনা বয়ে যাবে ততকাল বহমান রবে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব, বঙ্গবন্ধুর অবদান। কারণ বঙ্গবন্ধু মিশে আছে এই বাংলায়, মিশে আছেন এই বাংলার মাটিতে, এই বাংলার কোটি তরুণের প্রাণে। যে ধারা অব্যাহত রবে সারা জীবন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

তরুণদের চিন্তা ও মননে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থান তৈরির জন্য দরকার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান। বঙ্গবন্ধুর চর্চা। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে বা জানাতে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই তরুণদের মধ্যে লালিত হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর নীতি-নৈতিকতা। তৈরি হবে ঘরে ঘরে শেখ মুজিব। তবেই তরুণরা পথভ্রষ্ট হবে না। নীতি-নৈতিকতা ও নিজ দায়িত্বে এগিয়ে আসবে সমাজ ও দেশের কল্যাণে। তরুণরাই পারে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বুকে লালন করে সোনার বাংলা গড়তে যেখানে মা হাসবে আর শিশুরা খেলবে। বাংলা ও বাঙালির হূদয়ে অনন্তকাল  লালিত হোক  চিরঞ্জীব মুজিবের আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তার নির্দেশনায় উজ্জীবিত হোক তরুণরা। তরুণরা জেগে উঠুক জয় বাংলা স্লোগানে বঙ্গবন্ধুর নামে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা