শুধু বাংলাদেশে নয় বরং সারা বিশ্বে লাগামহীনভাবে বাড়ছে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর পরিসংখ্যান বলছে, পুরো বিশ্বেই গত ১২ মাস ধরে টানা খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এশিয়া ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকাতেও খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বোমুখী। বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার লাগামহীন।
কোনোক্রমেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে চড়া বাজারের লাগাম। বিশেষত পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগ থেকেই উত্তাপ হয়ে ওঠে পণ্য বাজার। বিশ্বজুড়ে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার ৫টি কারণ উল্লেখ করেছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
চাহিদা-সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন
ফোর্বসের মত সাময়িকীগুলো বলছে, ১৯৮০'র দশকের শুরুর দিকের পর এই প্রথম এত দ্রুত গতিতে বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম। দ্রব্যমূল্যের দামের ঊর্ধ্বগতি সহসাই কমছে না। দাম বৃদ্ধির মূলে যে বিষয় রয়েছে তা হচ্ছে ডিমান্ড বা চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ব্যাঘাত। যা বিশ্বজুড়ে চলমান মহামারীর কারণে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে। দেখা গেছে, করোনার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লকডাউনের কারণে নির্দিষ্ট পণ্যের ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য ঠিক না থাকায় বেড়ে যায় পণ্যেল দাম।
দেখা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার রোধে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নানা মেয়াদে বিভিন্ন সময় লকডাউন ঘোষণা করেছে। লকডাউনের কারণে নানা বিধিনিষেধ থাকায় খাদ্যপণ্যের বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। যোগানের অভাবে অনেক জায়গায় খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনো নানা দেশে লকডাউন থাকায় খাবারের উচ্চ চাহিদা এবং উৎপাদন কমে যাওয়া অব্যাহত থাকলে মু্দ্রাস্ফ্রীতি দেখা দেবে।
পরিবহন ব্যবস্থার সংকট
মহামারী করোনা ও করোনার নতুন নতুন ধরনের কারণে বিশ্বজুড়ে দফায় দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে আকাশ, স্থল ও নৌ-পথে পণ্য যাতায়াত ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামও বেড়ে যায়। দেশ বিদেশের বন্দরগুলোতে শ্রমিকের ঘাটতি হওয়ায় ঠিক সময়ে পণ্য খালাস করা যায়নি। এর ফলে খাদ্য-পণ্যের সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি তৈরি হয়। পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে বিশ্বজুড়ে।
পণ্য উৎপাদনে শ্রমিক সংকট
মহামারী করোনার কারণে দেশে দেশে বিধিনিষিধের কারণে পণ্য বাজার স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক শ্রমিক বেকার হওয়ার কারণে পণ্য বাজারে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। এমতাবস্থায় পণ্য উৎপাদনে শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে অনেক বেশি ছিল। ফলে দেশগুলোতে শ্রমিক সংকটের প্রভাব আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারে পড়ে। এছাড়া এ সময়ে নারী এবং বয়স্ক কর্মীরা অনেক বেশি হারে কর্মস্থল ছেড়েছেন, এবং অনেকেই পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবার পরেও ফেরেননি। এখনো করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিক বাজার স্বাভাবিক হয়নি।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি
বিশ্বে কোথাও না কোথাও যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব-ইয়েমেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি তেলের বাজারকে উত্তপ্ত করে তুলছে। ফলে জ্বালানির বাজার উত্তপ্ত হওয়ায় বেড়ে যায় পণ্যের বাজার। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির বড় কারণ হচ্ছে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি। ওইসিডিভুক্ত (তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট) দেশগুলোতে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের বড় অর্থনীতির দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যে নানামুখী উত্তেজনা চলছে, তার ফলে জ্বালানি নিয়ে নিকট ভবিষ্যতে এক ধরণের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অস্থিতিশীল চীনের খাদ্যবাজার
গত চল্লিশ বছরে চীনে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চীন পরিচিত হয়ে উঠেছে বিশ্বের মেগা কারখানা হিসাবে। চীনের এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যাকে 'অলৌকিক অর্থনীতি' বলা হয়ে থাকে, তার মূল চালিকাশক্তি বিশাল এক অভিবাসী কর্মী বাহিনী। এদের হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চীনের খাদ্যবাজার। এই বাজারে অস্থীতিশীল হওয়া মানে বিশ্বের খাদ্যবাজারে প্রভাব পড়া। করোনার উৎস দেশ চীনে মহামারী শুরুর সময়ে ব্যাপক নীতিবাচক প্রভাব পড়ে চীনের খাদ্যবাজারে। এতে করে বিশ্ব খাদ্য বাজার দর বেড়ে যায়।
গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে দেশে পণ্যের দাম বৃদ্ধির ১১ কারণ
প্রতি বছর বাংলাদেশে রোজার মাস সামনে রেখে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন হয়ে পড়ে। গত বছরের রমজানের বাজার লাগামহীন হওয়ার পেছনে ১১টি কারণ খুঁজে পায় সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। সেই উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে
প্রথাগত সরবরাহ প্রক্রিয়া
অতিরিক্ত মজুদের মাধ্যমে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি
অপর্যাপ্ত ও সমন্বয়হীন বাজার মনিটরিং
রমজানে পণ্যের বাড়তি চাহিদা
পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি
যানজট ও অতিরিক্ত পরিবহণ ব্যয়
অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি
স্বার্থান্বেষী মহলের অপতৎপরতা
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হার
ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
Copyright © 2026 kolomkotha. All rights reserved.