মেয়েটি প্রায় রাতের শেষ দিকে মেসেজ করত। আমি মেসেজের শব্দ পেয়ে চমকে উঠতাম। আর ভাবতাম, একটা মেয়ে কেন এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হবে।

নয়ত কেন শেষ রাতে ফেসবুকে এসে অপরিচিত কাউকে মেসেজ করবে। ঘুম কম হলে মেয়েদের চেহারায় এক ধরনের চাপ এসে যায়। এই মেয়ে কী কখনো নিজেকে আয়নায় দেখে? আমি প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে মেসেজ সিন করি।

মেসেজটি হয় দুই শব্দের ‘জেগে আছেন?’ আমি রিপ্লাই দেই ‘শেষ রাতে ঘুমাতে যায় এমন কোন পাখির নাম আপনার জানা আছে?’ মেসেজ সিন হয় কিন্তু কোন রিপ্লাই আসেনা। হয়ত মেয়েটি জানেনা শেষ রাতে কোন পাখি ঘুমাতে যায়। এই শহরে অসংখ্য পাখি আছে সারা রাত জেগে থাকতে থাকতে শেষ রাতের দিকে অনিচ্ছাসত্ত্বে একসময় চোখে ঘুম নেমে আসে।

ছোট বেলায় মধ্য রাতে ঘুম ভাঙলে একটা পাখির ডাক শুনতে পেতাম। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় পাখিটির নাম জম কুলি। এই পাখি মধ্য রাতে থেমে থেমে ডাকে । প্রতিটা ডাক যেন আমার বুকের মধ্যে আঘাত করত। আমি ভয়ে কেঁপে উঠতাম। আমার মনে হয় গবেষণা করে যদি এই পাখির কোন নাম দেওয়া যেত, তবে পাখিটির নাম হত অভিশপ্ত পাখি। এই শহরের অসংখ্য রাত জাগা পাখিদের মত এই পাখিরও কোন অভিশপ্ত গল্প আছে তাই হয়ত রাত জেগে কান্না করে।

একটু পর আবার মেসেজ আসে, ‘শেষ রাতে কোন পাখি ঘুমাতে যায় জানিনা। কিন্তু পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের রাতের শেষ দিক বলে কিছু নেই। আমি তাদের একজন’ মেয়েটির সাথে টুকটাক কথা হত আমার। কথা শুনে মনে হত মেয়েটি জীবনের প্রতি প্রচণ্ড হতাশ। ব্যক্তিগত অনেক কথা শেয়ার করত। আমার বিশ্বাস, এই মেয়ে যদি কখনো আমাকে সামনে থেকে দেখত তবে দেখেও না দেখার মত করে চলে যেত। কারণ আমরা ভার্চুয়াল জগতে যতটা পরিপাটি বাস্তব জীবনে কখনো ততটা নই।

হয়ত নিজে নিজে অনুতপ্ত হত, আমার মত একজন মানুষের কাছে জীবনের এত কথা বলার জন্য। মেয়েটি একদিন আমাকে প্রশ্ন করল ‘একজন মানুষ কে কতটা ভালবাসলে বুঝানো যায়, তাকে ছাড়া জীবন মূল্যহীন?’ আমি উত্তর না দিয়ে চুপ ছিলাম। যার কাছে আপনার কোন মূল্য নেই, তার কাছে অযথা ভালবাসার মূল্য দেখানো শুধুই বোকামি।

যে আপনার মূল্য বুঝেনা সে আপনার ভালবাসার মূল্য বুঝবে কী করে। একদিন রাতে আমি মোবাইল বুকের উপর রেখে গান শুনছিলাম। চোখে কিছুটা ঘুম ছিল। তখন মেয়েটির মেসেজ আসে, ‘আছেন?’ ‘জ্বী বলুন’ ‘আমি একটা সুইসাইড নোট লিখেছি’ মেয়েটির কথা শুনে মুহূর্তে আমার চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে যায়। আমি দ্রুত গান বন্ধ করে দেই।

‘কার জন্য সুইসাইড নোট লিখেছেন?’ ‘মানুষ সুইসাইড করার আগে অন্য কারো কাছ থেকে সুইসাইড নোট লিখে নেয়না’ ‘মানে কী?’ ‘মানে আমার সুইসাইড নোট লিখেছি। তবে বিশ্বাস করুন আমার মৃত্যুর পর এই সুইসাইড নোট কেউ কখনো খুঁজে পাবেনা’ ‘তাহলে সুইসাইড নোট লিখার কী প্রয়োজন ছিল?’ ‘কোন প্রয়োজন ছিলনা। এই সুইসাইড নোট শুধু আপনাকে দেখাবো।

কিন্তু আপনাকে প্রমিজ করতে হবে, সুইসাইড নোটটি আপনি একবার পড়বেন তারপর ডিলিট করবেন’ তিনশ সাড়ে তিনশ শব্দের সুইসাইড নোটের শেষ দিকে লেখা ছিল “কারো উপর আমার কোন অভিযোগ নেই। ভুল মানুষ কে চিনতে না পারাটা ছিল আমার জীবনের বড় ব্যর্থতা” ‘আপনি সুইসাইডের মত জঘন্য ভুল পথ থেকে ফিরে এসে দেখুন, আপনার জন্য অপেক্ষা করছে একটা সুন্দর পৃথিবী’ মেসেজটি সেন্ড করতে গিয়ে দেখি মেয়েটি আমাকে ব্লক করেছে নয়ত আইডি deactivate করে দিয়েছে।

কয়েকবার ট্রাই করেও মেসেজটি মেয়েটির কাছে পৌঁছাতে পারিনি। বার বার মনে হচ্ছিল কিছু একটা করার ছিল আমার। নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধী মনে হয়। এখনো আমি মেয়েটির মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। রাত জেগে থাকা মানুষ গুলো হয়তো খুব সুখে রাত জাগে না, হয়তো আমি তার প্রকষ্ট উদাহারন।

কলমে…
লিটন রায়
এম. এস. এস (স্নাতকোত্তর) রাষ্ট বিজ্ঞান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।