করোনা মহামারির আঘাতে মহাসংকটে বিশ্ব। একদিকে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে লাখো মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তেমনই বাড়ছে দরিদ্রতা। করোনাকালে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। তবে ধনকুবেরদের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। দেখা গেছে, মহামারির দুই বছরে তাঁদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে বহু গুণ। দ্বিগুণ হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনকুবেরের সম্পদ। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছেন শতাধিক ধনকুবের। তারা ধনীদের ওপর আরও বেশি কর আরোপের পক্ষে। তাঁদের ভাষ্য, এই মুহূর্তে ধনীদের পরিশোধিত করের পরিমাণ একেবারেই যথেষ্ট নয়। খবর রয়টার্সের।

স্থানীয় সময় আজ বুধবার এক খোলা চিঠিতে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাজনীতিকদের কাছে এমন আরজি জানান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১০২ জন ধনকুবের। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের নিয়ে চলমান সম্মেলনের মধ্যেই চিঠিটি প্রকাশ করা হলো। কর বাড়ানোর মধ্য দিয়ে করোনা মোকাবিলায় সরকারের পাশে থাকতে চান তাঁরা। লক্ষ্য, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ফারাক কমানো।

চিঠিতে যে ১০২ ধনকুবের স্বাক্ষর করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যাবিগেল ডিজনি। তিনি বলছেন, বর্তমান করব্যবস্থা কারচুপির মাধ্যমে ধনীদের সুবিধা দিতে করা হয়েছে। পরিশ্রমী মানুষের জন্য এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ব্যবস্থা সংস্কার করা উচিত।

ধনকুবেরেরা আরও বলেছেন, ‘কোটিপতি হিসেবে আমরা বলতে পারি, বর্তমান করব্যবস্থা ন্যায্য নয়। আমাদের বেশির ভাগই এমনটি বলবেন। গত দুই বছরে বিশ্ব যখন অপরিসীম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে সময়ে আদতে দেখা গেছে আমাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে।’

এর আগে গত সোমবার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফাম। সেখানে বলা হয়, মহামারিকালে বিশ্বে শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। এই ধনীদের ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ বেড়ে দেড় ট্রিলিয়ন হয়েছে। প্রতিদিন তাঁদের সম্পদ বেড়েছে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এই মহামারিকালে যে পরিমাণ সম্পদ ধনীদের বেড়েছে, গত ১৪ বছরে সেই পরিমাণ সম্পদ বাড়েনি। কিন্তু এমন সময়ে সম্পদ বাড়ছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি সংকটের মুখে রয়েছে।

এই অর্থনৈতিক অসমতার কারণে বিভিন্ন ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না দরিদ্র মানুষ। ক্ষুধা, লিঙ্গবৈষম্যগত সহিংসতা বেড়েছে। অক্সফাম বলছে, আর্থিক অসমতার কারণে স্বাস্থ্যসেবার সংকট, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব পড়ছে। এতে প্রতিদিন ২১ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। মহামারির কারণে ১৬ কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর–পদ্ধতি সংস্কারের কথা বলেছে অক্সফামও।

বুধবারের খোলা চিঠিতে ধনকুবেরেরা নিজেদের ‘প্যাট্রিওটিক মিলিয়নিয়ারস’ বা দেশপ্রেমিক কোটিপতি আখ্যা দিয়েছেন। সেখানে নিক হানাওয়া নামের এক ধনকুবের বার্ষিক ‘সম্পত্তি কর’ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে চরম বৈষম্য কমবে, স্বাস্থ্যসেবার মতো সরকারি পরিষেবাগুলো টেকসই হবে এবং রাজস্ব আয় বাড়বে বলে মনে করছেন ধনকুবেরেরা।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকটি দেশের বাইরে আবাসন খাত, স্টক ও শিল্পকর্মের মতো সম্পত্তির ওপর ধনীদের কর দিতে হয় না। শুধু সেগুলো বিক্রির সময় তাঁদের কর পরিশোধ করতে হয়। অক্সফামের সঙ্গে সম্পত্তি কর নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে এই ধনকুবেরদের শিরোনামের জোট ‘প্যাট্রিওটিক মিলিয়নিয়ারস’। সেখানে বলা হয়েছে, ৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের মালিকদের ওপর ২ শতাংশ এবং কোটিপতিদের ওপর ৫ শতাংশ করে সম্পত্তি কর আরোপ করা হলে ২ দশমিক ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়া যাবে। এই অর্থ বিশ্বের ২৩০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে যথেষ্ট। পাশপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে।

একই কথা বলছে বিশ্বব্যাংক। ২০২১ সালে সংস্থাটির প্রকাশিত এক নিবন্ধে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সম্পত্তি করের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক মুখপাত্র বলেন, ‘সম্পত্তি কর’ ব্যবস্থা সুইজারল্যান্ডে চালু রয়েছে। এই কর অন্যত্র চালু করতে সুইজারল্যান্ডের মডেল ভালো কাজে দিতে পারে।