গত বছর এই সময়ে রাজশাহীর হোজা বিলের মাঝের রাস্তাটি কার্পেটিং করা হয় প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে। কিন্তু এক বছরও পার হতে পারেনি। এরই মধ্যে রাস্তাািট ভেঙে চৌচির। মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের থাবায় রাস্তার দুই ভেঙে নিচে নেমে গেছে। উঠে গেছে কার্পেটিংসহ নিচের ইটের খোয়ও। এই অবস্থায় আবারও বেহার হয়ে পড়েছে রাস্তাটি। কিন্তু আবারো ওই রাস্তা দিয়ে ছুটছে পুকুর কেটে তোলা মাটি বহরকারী ট্রাক্টর।

সরেজমিন ঘুরে দেকা গেছে, হোজা বিলের শুধু এই রাস্তা নয়, এভাবে রাজশাহীর অন্তত ৫০টি রাস্তা নষ্ট হয়েছে গত এক বছরে। এর মধ্যে বিলের পানিস কমার সঙ্গে সঙ্গে চলতি বছরে আবারো পুকুর কাটার মহোৎসবে নেমেছেন প্রভাবশালীরা। জেলার দুর্গাপুর, পুঠিয়া, চারঘাট, বাগমারা, বাঘা, পবা, মোহনপুরজুড়ে চলছে একের পর এক পুকুর খনন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু এই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই কৃষি জমি পরিণত করা হচ্ছে পুকুরে।

ফলে কৃষি জমি হারাতে হচ্ছে ব্যাপক হারে। এতে করে কৃষির ওপর চাপও বাড়ছে বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু স্থানীয় পুলিশের উদাসিনতায় ও ক্ষমতাসীনদের দাপটে পুকুর খনন রোধ করা যাচ্ছে না বলে একাধিক কৃষি কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন কোথাও কোথাও অভিযান করে জেল-জরিমানাও করেছেন ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে। জেলার দুর্গাপুর, পবা ও চারঘাটে অভিযান চালানো হলেও অন্যান্য উপজেলায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযান শুরু হয়নি। ফলে অবাধে কাটা হচ্ছে পুকুর।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর দুর্গাপুরের কয়ামাজমপুর বিলের যেদিকে নজর যায় শুধু পুকুর আর পুকুর। গত কয়েক বছরে এই বিলে অন্তত গড়ে উঠেছে শতাধিক পুকুর। হারিয়েছে অন্তত এক হাজার একর ফসলি জমি। এরই মধ্যে চলতি শীতেই আবার বিলের কোনো কনো স্থানে পুকুর কাটা শুরু হয়েছে। এই বিলে আবারও পুকুর কাটার অপরাধে তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর জরিমানা আদায় করা হয়। এর মধ্যে আলিয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা ও পানানাগর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য এবং আওয়ামী লীগ কর্মী নূরুল ইসলামসহ তিন দিনে তিনজনের জরিমানা করা হয়।

পবার গোবিন্দপুর বিলেও একই অবস্থা। এই বিলে মঙ্গলবার রাতে দামকুড়া থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযান চালিয়ে হাবিবুর রহমান নামে একজনকে গ্রেপ্তারের পর ভ্রাম্যমান আদালতে হাজির করা হয় তাঁকে। পরে হাবিবুরকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও পুকুর না কাটার মুচলেকা নেওয়া হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দামকুড়া থানার ওসি মাহবুব আলম। তিনি বলেন, ‘অবাধে পুকুর কাটা শুরু হয়েছে। এতে করে কৃষি জমি হারাতে হচ্চে। এছাড়াও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এ কারণে দামকুড়া এলাকার পুকুর খনন রোধে ব্যাপক নজরদারি রাখা হয়েছে। তবে কেউ কেউ রাতের আঁধারে পুকুর খননের চেষ্টা করছেন। এটিও রোধে পুলিশ তৎপরতা শুরু করেছে। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব পুকুর কাটার সঙ্গে জড়িত থাকায় অভিযান চালাতে গিয়েও অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ অনেকেই ভয়ে মুখ খুলছে না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন বিলে চলতি বছর অন্তত এক হাজার পুকুর খননের উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নেমেছে একাধিক চক্র। স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের হাত করে এসব পুকুর খনন কাজ শুরু হয়েছে বার প্রস্তুতি চলছে। বাগমারায় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে পুকুর খনন চলছে। ফলে সেখানে অভিযান চালানো যাচ্ছে না। বলে দাবি করেছেন থানার একাধিক কর্মকর্তা।

দুর্গাপুরে জুগিশো গ্রামের আকবর হোসেন বলেন, চোখের সামনেই খেতের জমি কেটে পুকুর হয়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু বলার নাই। শুধু আওয়ামী লীগের লোকজনকে ম্যানেজ করে প্রশাসনকে কিছু টাকা দিয়ে আসলেই পুকুর কাটা হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি।

রাজশাহীর বাগমারার মাঝিড়া গ্রামের হযরত আলী বলেন, ‘গোটা বাগমারাজুড়েই এবার পুকুরে ভরে গেছে। অন্যান্য বার প্রশাসন ব্যাপক বাধা দিত। ফলে পুকুর খনন হলেও এতোটা করার সাহস পেত না। কিন্তু এবার কোনো বাধা না থাকায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই যাচ্ছে-তাই ভাবে পুকুর খনন হয়েছে। কেউ কিছু বলতে পারেনি। অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।’

এদিকে পুকুর খনন বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, পুকুর খনন নিয়ে এবার আমরা শক্ত অবস্থানে যাবো। তবে বাধা দিয়েও কোনো লাভ হয় না। রাতের আঁধারে চলে পুকুর খনন। এর জন্য সচেতনতা জরুরী।’