আবুল হাশেম, রাজশাহী ব‍্যুরোঃ ১৩ ডিসেম্বর নাটোরের লালপুর হানাদার মুক্ত দিবস। নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে লালপুরে। এ বিষয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল লালপুর উপজেলার দুয়ারিয়া ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮ জনকে গুলি করে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ হয় এই লালপুর উপজেলার দুর্গম ময়না গ্রামে। ৩০ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর ২৫নং রেজিমেন্ট নগরবাড়ি হয়ে নাটোরে আসার পথে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।এই দলের সদস্যরা পথ ভুলে লালপুরের ময়না গ্রামে ঠুকে পড়ে।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন মুহাকুমা/শহর নাটোর সহ আশে পাশের কয়েক শত মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা ওই গ্রাম ঘিরে ফেলে।দু’দিন ধরে চলে যুদ্ধ যা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ।এই যুদ্ধে মুক্তি বাহিনী ঐ হানাদারদের ২৫ নং রেজিমেন্ট ধ্বংস করে দেয়,এবং ৯ পাকসেনা নিহত হন।

পরে ৫ই মে পাকসেনারা ময়না গ্রামের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এবং আক্রোশে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লিঃ এলাকা ঘেরাও করে মিলের প্রধান প্রশাসক(জিএম)আনোয়ারুল আজীম সহ প্রায় ২০০ শ্রমিক- কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে চিনিকল এলাকার পুকুর পাড়ে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

স্বাধীনতার পর এই পুকুরের নাম শহীদ সাগর এবং গোপালপুর রেলওয়ে স্টেশনের নামকরণ আজিমনগর করা হয়।
পরে ২৯শে মে খান সেনাদের একটি দল একই উপজেলার চংধুপইলের পয়তারপাড়া গ্রামে নদীর পাড়ে ধরে এনে ৫০ জনেরও অধিক নিরীহ লোককে গুলি করে হত্যা করেন।

২৫ জুলাই ২২ জনকে লালপুর নীলকুঠির নিকটে হত্যা করে এবং ২৬ জুলাই একই স্থানে চারজনকে হত্যা করে।
পরে ২০ জুলাই রামকৃষ্ণপুর গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও ৫ জনকে হত্যা করে। ৩০শে জুলাই বিলমাড়ীয়া হাট ঘেরাও করে বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে ৫০ জনেরও অধিক লোককে হত্যা করে ।

৩১শে জুলাই বিলমাড়ীয়ার বাথানবাড়ীয়া গ্রামে বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং ১৬-১৮ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।
মোট কথা ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাক বাহিনী ও রাজাকারদের সহায়তায় লালপুরের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা,নির্যাতন, অগ্নিকান্ড, ও লুটতরাজ চালায়।পরবর্তীতে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনের মুখে ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনারা উপজেলার মহেষপুর গ্রামে অন্তত ৩০ জনকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

ফলে ১৩ ডিসেম্বর থেকে লালপুর পাকহানাদারমুক্ত হয়।স্বাধীনতার পর থেকে ১৩ ডিসেম্বর লালপুর হানাদার মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।এরই ধারাবাহিকতা এবারও লালপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিকদল ও সহযোগি অঙ্গ সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন। দিবস টি পালন উপলক্ষে সকালে লালপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিত্বে পুষ্পমাল্য অর্পন করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন ঝুলফু,সাধারণ সম্পাদক ইসাহাক আলী সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ।