
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজসমূহের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মনোনীত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালিত হয় নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্যদের দ্বারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত হন শিক্ষকদের ভোটে। এক কথায় বলতে গেলে, নিম্ন মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে এবং এই নির্বাচনে মতাদর্শ উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই।
বাংলাদেশে এ যাবৎকাল যতগুলো সরকার (নির্বাচিত/অনির্বাচিত) ক্ষমতায় এসেছে, তারা কখনোই শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বা রাজনৈতিক দলের সমর্থনের কারণে কোনো হেনস্থা বা নির্যাতন করেনি। তবে ৫ আগস্ট ২০২৪ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই সারাদেশে ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, অনেক শিক্ষকের এমপিও স্থগিত করা হয়, বেতন বন্ধ করা হয়, সাসপেন্ড করা হয় এবং অনেককে স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া জুলাই-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিস, মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্থা করার মতো ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একাধিক কঠোর নির্দেশনা ও অফিস আদেশ জারি করে।
উক্ত আদেশে যে সকল শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, তাঁদের স্বপদে পুনর্বহাল করা, স্থগিত এমপিও ছাড় দেওয়া এবং আদেশ না মানলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থানের কারণে নিম্ন মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসতে শুরু করে এবং শিক্ষকদের আতঙ্ক কমতে থাকে।
ঠিক এরকম একটি পরিস্থিতিতে ‘এশিয়া পোস্ট’ নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ০৪/০৮/২০২৬ ইং তারিখে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। রিপোর্টটির মূল ভিত্তি ছিল একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ। উক্ত গ্রুপে নাম থাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, তাঁরা এই গ্রুপ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বা কোনো পোস্টও করেননি; অথচ নিউজটির পর থেকে তাঁরা কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এই সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী মোহাম্মদ নাফিজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তদন্ত বা তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এমনকি এশিয়া পোস্টের তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও কেবল অতীতে নির্দিষ্ট একটি শিক্ষক প্যানেলকে সমর্থন করার কারণে অনেককে তদন্তে ডাকা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ বা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নানামুখী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. আব্দুল ওদুদ, অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ড. মোবারক হোসেনের বেতন বন্ধের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন আটকে দেওয়া এবং বিভাগীয় ও পাঠদান কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমনকি শারীরিক গুরুতর চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণের অনাপত্তিপত্র (NOC) দেওয়া হচ্ছে না, যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক শবনম জাহানসহ ১১ জন শিক্ষক চিকিৎসার জন্য NOC পাননি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের কক্ষে মব করে ভাঙচুর ও হেনস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে নাম থাকার অজুহাতে মার্কেটিং বিভাগের যোগ্য শিক্ষকদের বাদ দিয়ে সরকারদলীয় ডিনকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া এবং প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা তদন্ত কমিটি গঠনের অভিযোগ রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার, সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগর, সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন ও অধ্যাপক সালমা খাতুনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের নামে শিক্ষকদের মানসিকভাবে পীড়াদায়ক প্রশ্ন করা ও শোকজ নোটিশ জারি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এশিয়া পোস্টের সংবাদ ও পরবর্তী তদন্ত কমিটিগুলোর পেছনে শিক্ষক বরখাস্ত করে নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যের উদ্দেশ্য জড়িত থাকতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশকে স্থবির করে তুলেছে। দেশের প্রচলিত আইনের কোনো তোয়াক্কা না করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মব কালচারের ধারাবাহিকতায় অন্য এক সংস্করণে আবির্ভূত হয়েছে।
এসব বেআইনি পদক্ষেপ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক নির্দেশনা ও অফিস আদেশের উদ্দেশ্য ও দেশের প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর রহমান বিষয়টির আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি চিহ্নিত করে বলেন—একটি অখ্যাত পত্রিকার নিউজের ওপর নির্ভর করে হঠাৎ তথাকথিত তদন্তের নামে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষায় গভীর সংকট তৈরি হবে। একজন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় লব্ধ জ্ঞান দিয়ে জাতিকে সমৃদ্ধ করেন, যা নতুন কোনো শিক্ষক এসে দ্রুত মেটাতে পারেন না।
তিনি বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার তকমা দিয়ে তথাকথিত তদন্ত বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা অতীব জরুরি এবং কেউ যদি রাষ্ট্রদ্রোহিতার সাথে জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে কেবল রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে যথার্থ আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে এবং আদালতে আইন অনুযায়ী যথার্থ বিচার হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কখনই কথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো আইনি পদক্ষেপ বা আদালতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার করতে পারে না। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বেআইনিভাবে পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড শিক্ষকদের মানবাধিকার, সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং দেশের প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা বা মতামত প্রকাশ আইনি কাঠামোয় স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাক্-স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২৬ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ICCPR) ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ICESCR) ১৩ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। বাংলাদেশ উক্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র।
ইউনেস্কোর ১৯৯৭ সালের ‘উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষক-কর্মীদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশমালা’ অনুযায়ী একাডেমিক স্বাধীনতা, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং শিক্ষকদের ন্যায়সংগত সুরক্ষার ওপর কঠোর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হয়রানি ও রাজনৈতিক তালিকায় তদন্তের বিষয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ‘স্কলার্স অ্যাট রিস্ক’ (Scholars at Risk)-সহ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব দরবারে দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এবং মেধা পাচার (Brain Drain) বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য পরীক্ষার কারখানা নয়; বরং এটি স্বাধীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সুনির্দিষ্ট অপরাধের পার্থক্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সুনির্দিষ্ট অপরাধ থাকলে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত হতেই পারে, কিন্তু তদন্তের নামে শিক্ষক হয়রানি, অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষ্য হতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষতা প্রশাসনের রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্য, একাডেমিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের ওপর নির্ভর করে। তাই কাল্পনিক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়রানিমূলক তদন্ত বন্ধ করে এবং তদন্তকে ভয়ের বদলে ন্যায়বিচারের মাধ্যম হিসেবে নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত শিক্ষার স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
Copyright © 2026 kolomkotha. All rights reserved.