১০ বছর আগেও এলাকার নাম ছিল রানিরঘাট মোড়। ওই সময় একটি একটি করে গড়ে উঠেছিল চারটি ভাতের হোটেল। হোটেলগুলোর মালিক চার নারী। পরিচালনাও করেন তারা। রাস্তার দুই পাশে দুটি করে চারটি হোটেল। এখন সবগুলো ভাবির হোটেল নামে পরিচিত। সেই সঙ্গে রানিরঘাট মোড়টিকে এখন সবাই ভাবির মোড় বলেই চেনেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হোটেলগুলো গড়ে উঠেছিল এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর রাবার ড্যাম, সেতু ও রাস্তা নির্মাণের শ্রমিকদের নাস্তা, দুপুরের খাবার বিক্রির জন্য। হোটেল মালিকদের ভাবি বলে ডাকতেন শ্রমিকরা।

রুচিকর, স্বাদে ভরপুর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাদ্য পরিবেশনের কারণে ছড়িয়ে পড়ে হোটেলগুলোর সুনাম। দূরদূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেন ভোজনরসিকরা। একসময় এলাকাটি ভাবির মোড় বলে পরিচিতি পায়। ভাবির মোড়ের অবস্থান দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম পরেমেশ্বরপুরে।

ভাবির হোটেলে রান্না হওয়া হাঁসের মাংস

ভাবির হোটেলে রান্না হওয়া হাঁসের মাংসসরেজমিনে দেখা যায়, তিন রাস্তার সংযোগস্থলে এই মোড়। ১৫-১৬টি দোকান। দোকান মালিকরা যে যার মতো করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ভোজনরসিকদের জন্য ভাবির মোড়ের বড় আয়োজন হাঁসের মাংস। চার ভাবির হোটেলের সবকটিতেই হাঁসের মাংস পাওয়া যায়।

হোটেলগুলোতে ঢুকতেই চোখে পড়বে দেয়ালে নানা ধরনের আলপনা আর কিছু লেখা। যেমনটা রয়েছে, ‘বাকি দেওয়া বড় কষ্ট, বাকিতে হয় বন্ধুত্ব নষ্ট; ভদ্রতা বংশের পরিচয়’। এই লেখার ঠিক একটু ওপরে তাকালেই দেখা যায় একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘ভাবির হোটেল-১’।

হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকে। ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেলো মানুষে পরিপূর্ণ অবস্থা। টেবিলের ওপর গামলা ভর্তি ভাত, কড়াই ভর্তি হাঁসের মাংস। পর্যাপ্ত লোক খাওয়ার টেবিলে বসিয়ে হোটেল মালিক দোকানের গেট লাগিয়ে দেন। কেউ এসেছেন পরিবারসহ, কেউ এসেছেন বন্ধুদের নিয়ে। এ যেন ভোজনরসিকদের ‘চাঁদের হাট’।

ভাবির হোটেলে রান্না হওয়া হাঁসের মাংস

ভাবির হোটেলে রান্না হওয়া হাঁসের মাংসএমন দৃশ্য এই হোটেলেরই নয়, অপর তিন ভাবির হোটেলেরও একই অবস্থা। হোটেলগুলোর পাশে পান, সিগারেটসহ কোমলপানির ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে মোড়টি জমজমাট। শুধু ভোজনরসিক নন, ভ্রমণপিপাসুদের চোখের খোরাক মিটিয়ে দেবে মোড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা টাঙ্গন নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য।

কেন রানিরঘাট মোড় এখন ভাবির মোড় নামে পরিচিত তা জানতে দিনাজপুর শহর থেকে ৩৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলার পরেমেশ্বরপুর এলাকায় যান প্রতিনিধি। ওই এলাকার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে টাঙ্গন নদী। তার ওপর নির্মিত রাবার ড্যাম। রাবার ড্যাম পার হয়ে সেতু। সেতু পার হলেই চোখে পড়বে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টির খোরাক দেবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১০ বছর আগেও রানিরঘাট মোড় নামেই এলাকার পরিচিতি ছিল। প্রকৃতি দেখতে আসা ভ্রমণপিপাসু, ভোজনরসিকদের সমাগম রানিরঘাটের নাম পরিবর্তন করেছে। রাবার ড্যাম ও সেতুকেন্দ্রিক নির্মাণশ্রমিকদের কাছে খাবার বিক্রি করতে হোটেল দেওয়া হয়। প্রথমে ভাবির হোটেল পরিচিতি পায়। এরপর ধীরে ধীরে এটিকে ভাবির মোড় বলে ডাকতে শুরু করেন সবাই।

ভাবির হোটেলে ভিড় লেগেই থাকে

ভাবির হোটেলে ভিড় লেগেই থাকেভাবির মোড়ের দোকানগুলোতে খাবার খেতে লোকজন আসছেন বাস, মাইক্রোবাস কিংবা মোটরসাইকেলযোগে। শুধু দিনাজপুর থেকে নয়; এখানে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন।

ফেসবুকে ভাবির মোড়ের কথা জানতে পেরে ঠাকুরগাঁও থেকে এসেছে ইম্মি চৌধুরীর পরিবার। কথা হয় তার পরিবারের সদস্য রূপক চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, জায়গাটি অনেক সুন্দর। ফেসবুকে জানতে পারি, ভাবির মোড়ে মজার হাঁসের মাংস পাওয়া যায়। খাবারও মানসম্মত।

একই পরিবারের সদস্য অ্যানিশা চৌধুরী বলেন, পরিবারসহ মাইক্রোবাসে এসেছি। এখানে প্রচুর ভিড়। অপেক্ষা করতে হচ্ছে ভাবির হোটেলের গেস্ট রুমে। আসার উদ্দেশ্য একটাই, হাঁসের মাংসের স্বাদ নেওয়া।

ইম্মি চৌধুরী বলেন, শুনেছি এখানকার খাবারের মান অনেক ভালো। তা শুনেই আসা। মানুষের ভিড় দেখে বোঝা যায়, হোটেলগুলোর জনপ্রিয়তা। আশপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখেও অনেক ভালো লেগেছে।

ভাবির হোটেলে খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকা আরমান হোসেন বলেন, ভাবির মোড়ের হোটেলে সুস্বাদু হাঁসের মাংস পাওয়া যায়। বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। এসে দেখি শেষ হয়ে গেছে। আরও রান্না হচ্ছে, রান্না হলে খেয়ে যাবো। দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর সিরিয়াল পেলাম।

ভাবির মোড়ের চার হোটেলের মালিক হলেন বেলি আক্তার (৪০), মাসতুরা বেগম (৪৫), তাসলিমা আক্তার (৪০) ও মেরিনা পারভীন (৩৭)।

ভাবির হোটেলে চলছে খাওয়াদাওয়া

ভাবির হোটেলে চলছে খাওয়াদাওয়াতাসলিমা আক্তার ও মেরিনা পারভীন জানিয়েছেন, প্রতিটি হোটেলে দিনে বেচাকেনা হয় সাত-আট হাজার টাকা। সপ্তাহে শুক্রবার প্রতিটি হোটেলে বিক্রি হয় দ্বিগুণ।

হোটেলের বাইরে পান, সিগারেট আর কোমলপানীয় বিক্রি করছেন নুসরাত খাতুন। তিনি এই এলাকার বাসিন্দা। নুসরাত বলেন, এই মোড়ে আসার রাস্তা আগে সরু ছিল। রাস্তা যারা তৈরি করতে এসেছিলেন তারা নাস্তা করতে এখানে আসতেন। তখন দুই ভাবির দোকান ছিল, ভাত রান্না হতো না। পরে ভাতের হোটেল হয়। তারাই প্রথম এই জায়গাটিকে ডাকতে শুরু করলো দুই ভাবির মোড়। পরে আরও দুই ভাবি দোকান দেন। হোটেলগুলোতে ভাত-মাংস রান্না শুরু হলো। মানুষ এখানে ভাত আর হাঁসের মাংস খেতে আসে। একসময় এলাকাটি ভাবির মোড় নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ভাবির মোড় নামের গোড়াপত্তনকারী রাবার ড্যাম সেতুর নির্মাণশ্রমিকরা। এমনটি জানিয়েছেন ভাবির হোটেলের মালিক বেলি আক্তার।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে যখন রাবার ড্যাম ও সেতু তৈরি হয়, তখন আমরা দোকান শুরু করলাম। নদীর মাছ, ব্রয়লার মুরগি আর হাঁসের মাংস রান্না করি। যখন সেতু নির্মাণ শেষ হলো তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করলো। এভাবেই ছড়িয়ে পড়লো ভাবির মোড়ের নাম।

বেলি আক্তার বলেন, এখানে মানুষ যত টাকার খাবার খেতে চায় তত টাকার খেতে পারে। যদি ১০০ টাকা নিয়ে আসে আমরা ৮০ টাকার হাঁসের মাংস আর ২০ টাকার ভাত দিই। আর অনেকে আসে পরিবার নিয়ে। তাদের বিল আসে ১২০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত।

এ বিষয়ে স্থানীয় ছাতইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবু বলেন, এলাকাটির নাম রানিরহাট। তবে কয়েকজন নারী সেখানে দোকানদারি করায় এলাকাটি ভাবির মোড় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।