
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট সমাজসেবী কাজী শরিফ মাহমুদের নেতৃত্বে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘যুবদূত’। তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি দেখতে দেখতে পার করেছে দুই বছর। শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিক সহায়তা ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ নানা সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে যুবদূত।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দিতে কাজ করে আসছে সংগঠনটি। দূর-দূরান্তের গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষা উপকরণ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলছে যুবদূতের স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রতি বছর শিশুদের মাঝে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রমের নতুন বছর শুরু হয়।
শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও রয়েছে যুবদূতের নানা উদ্যোগ। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কেও দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ধারণা।
যুবদূতের কর্মকাণ্ডে রয়েছে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ এবং শিশুদের ত্বক সুরক্ষায় সচেতনতামূলক উদ্যোগসহ বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম। সংগঠনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণায় বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতার বার্তাও নিয়মিত তুলে ধরা হয়।
যুবদূতের দর্শনে শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেকে জানা, সমাজকে বোঝা এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধ তৈরিও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এমন লক্ষ্যেই বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
তবে সমাজসেবার এই পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন যখন কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখন মানুষের নাগালের মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় যুবদূত। রমজান মাসজুড়ে পরিচালিত হয় ‘রমজান জনসেবা বাজার’। স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সংগঠনটি অর্জন করে প্রশংসা ও ভালোবাসা।
তবে এই উদ্যোগ চলাকালীন ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ২২ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একটি সন্ত্রাসী দল স্টলে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ঘটনাটি যুবদূতের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও সমাজসেবায় যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কিন্তু ওই ঘটনার পরও নিজেদের সামাজিক কার্যক্রম থেকে সরে আসেনি সংগঠনটি।
প্রতিকূলতা, বাধা ও নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে দুই বছরে যুবদূত হয়ে উঠেছে তরুণদের সামাজিক অংশগ্রহণের একটি প্ল্যাটফর্ম। সংগঠনটির কার্যক্রমে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এবার শিশুদের মাঝে ২ হাজার গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে যুবদূত। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের মানসিকতা গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুই বছরের এই পথচলা সম্পর্কে যুবদূতের প্রতিষ্ঠাতা কাজী শরিফ মাহমুদ বলেন, “তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে কাজে লাগিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যুবদূতের মূল লক্ষ্য। শুরুতে স্বপ্নটি ছোট পরিসরে ছিল, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও তরুণদের অংশগ্রহণ আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতেও শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিক সহায়তা ও পরিবেশ রক্ষায় আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।”
যুবদূতের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, “দুই বছরে আমরা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু কোনো বাধাই আমাদের থামাতে পারেনি। যুবদূতকে আমরা শুধু একটি সংগঠন হিসেবে নয়, বরং তরুণদের মানবিক ও সামাজিক কাজে যুক্ত করার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই বছরের পথচলায় যুবদূতের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়, বরং শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশকে স্বেচ্ছাসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও কেবল উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুদের মাঝে ২ হাজার গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।
দুই বছর পেরিয়ে যুবদূতের প্রত্যয় এখন আরও বিস্তৃত, তারুণ্যের শক্তিকে মানবিক কাজে নিয়োজিত করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চায় সংগঠনটি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৫
Copyright © 2026 kolomkotha. All rights reserved.