নতুন বছরে কয়েকটি ইস্যুতে উত্তাপ ছড়াতে পারে দেশের রাজনীতি। নির্বাচন কমিশন গঠন থেকে শুরু করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি— এসব মিলিয়েই বছরজুড়ে রাজনীতির মাঠ গরম থাকবে বলে মনে করেন বিরোধী নানা দলের নেতারা।

নতুন বছরের রাজনীতি কেমন হবে— এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কথা হয়। তারা বলছেন, করোনা সংকট থেকে অর্থনীতি কিছুটা স্বাভাবিকের দিকে গেলেও নতুন করে সংক্রমণ বাড়লে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু ও আন্তর্জাতিক-ভূরাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন কিছুর দেখা মিলতে পারে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দলটির জোটসঙ্গী নেতাদের ভাষ্য, করোনার প্রভাবে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সরকার সেসব পূরণ করতে পারলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে।

এ ছাড়া ক্ষোভ-বিক্ষোভের জায়গা তৈরি হতে পারে, তবে সংকট প্রকট হবে না— এমনটাই আশাবাদ সরকারপন্থী নেতাদের। আন্দোলনের নামে সহিংসতার সৃষ্টি হলে রাজনৈতিকভাবে সেটার মোকাবিলা করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।

বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধীদলগুলোর নেতারা বলছেন, নতুন বছরে রাজনীতির মূল ইস্যু হবে সবার অংশগ্রহণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পদ্ধতি নিশ্চিত করা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর কিংবা ২০২৪-এর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিরোধীদের বোঝাপড়া জোরদার হবে নতুন বছরেই। এ কারণে দেখা দিতে পারে নতুন মেরুকরণ। তৈরি হতে পারে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, ‘আওয়ামী লীগ যে পথে হাঁটছে, তাতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ছাড়া উপায় থাকবে না।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার কিছু দেখছি না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে কেউ রাজনীতি করলে মাঠ উত্তপ্ত হবে কেন? তারা যদি মাঠ গরমের নামে অতীতের মতো চোরাগোপ্তা হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুরের চেষ্টা করে তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। জনগণকে তারা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে আমরা জনগণকে সচেতন করবো।’

ফারুক খান আরও বলেন, ‘বিএনপি রাজনীতির মাঠে নেমেছে, এটা ভালো লক্ষণ। তবে তারা যে কারণে মাঠে নেমেছে সেটা ভুল রাজনীতি। খালেদা জিয়া দেশের প্রচলিত আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা পেয়েছেন। এই রাজনীতি নিয়ে মাঠে নামলে বিএনপি জনসমর্থন পাবে না’।

দয়া ভিক্ষা চাওয়া কোনও রাজনীতি নয়, বরং ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবেন; সেই ইস্যু নিয়ে মাঠে নামলে ভালো করবেন বলেও পরামর্শ এই আওয়ামী লীগ নেতার। তিনি বলেন, `অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ক্ষমতায় আসার চিন্তা বাদ দিয়ে নির্বাচনের পথে এলেই তারা জনসমর্থন পেতে পারে।’

আর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, নতুন বছরে অনেক নতুনের সঙ্গে পরিচয় হতে পারে। আবার অনেক কিছু কেড়েও নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘ওমিক্রন নিয়ে বড় শঙ্কা রয়েছে। তবে দেশি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে প্রত্যাশিত কিছু দেখা যেতে পারে। সরকার তার আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ধারণা, নতুন বছরে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ কিছু ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ‘কিছু সময় ধরে ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এর প্রভাব যেমন রাজনীতিতে পড়বে, তেমনি সেটা আরও বিস্তৃত হয় কিনা, সেটাও লক্ষ্যণীয়।’ তবে ‘সহসাই এসব নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই’ বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘যারা কান পেতে রাখেন তারা হয়তো কিছুটা বুঝতে পারছেন।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে বড় করে দেখছেন না বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তার ব্যাখ্যা, ‘এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ মিয়ানমার, ইরানেও তারা করেছে। সেসব দেশ তো ভালোভাবেই চলছে।’

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আশা করি নতুন বছরে রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকবে। যদিও কোনও কোনও দল নীতিগতভাবে মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করবে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমার বিশ্বাস—বিরোধীরা সে অর্থে সফল হবে না।’

বিএনপি যদি রাজপথে সক্রিয় হয়, সে ক্ষেত্রে নতুন বছরের রাজনীতিতে প্রভাব কেমন পড়বে—এমন প্রশ্নে দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য কোনও প্রভাব পড়বে না। কারণ এটা ধরে রাখা বিএনপির পক্ষে কঠিন। সমস্ত জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার কৌশল তারা সেভাবে রপ্ত করতে পারেনি।’

‘নতুন বছরের রাজনীতি হবে আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতি’ এমনটা বললেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।

‘নতুন বছরের রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট সৃষ্টি হবে’ এ মন্তব্য করেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মনজু। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘নতুন বছরে নির্বাচন কমিশন গঠন ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা থাকবে। আন্তর্জাতিকভাবে ঢাকাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ভূতাত্ত্বিক কৌশলও পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা আনতে পারে।’

‘নতুন বছরে রাজনীতি সম্পর্কে অগ্রিম ধারণা করার কোনও সুযোগ নেই’ বলে মত দেন বিএনপির একজন উচ্চপর্যযায়ের দায়িত্বশীল। তিনি মনে করেন, আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা, ও সরকারের ভেতরে অস্থিরতার কারণে ঠিক কী পরিস্থিতির উদয় হয়, তা অগ্রিম বলার সুযোগ কম। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সরকার পরিস্থিতি আয়ত্বে নিতে সক্ষম হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন অনিবার্য।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল- বিএনপির সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে এসে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও সরকারের অভ্যন্তরীণ যেসব বিষয় উঠে আসছে, তাতে করে সামনের বছর আশাপ্রদ হবে— এমন কোনও অবস্থানে যেতে পারছেন না তারা। সব মিলিয়ে সরকার ও রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং শক্তিশালী কিছু রাষ্ট্রের তৎপরতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন কয়েকটি দলের প্রভাবশালী নেতা।

তথ্যসূত্র- বাংলা ট্রিবিউন