রাকিব রিফাত-
​ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ১ নম্বর গ্রেডের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মোঃ তোজাম্মেল হোসেন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, আরবী সাহিত্য চর্চা এবং শিক্ষক রাজনীতির অঙ্গনে এক পরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক রাজনীতি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিচে তাঁর জীবন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

​১. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচিতি

​অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মূলবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্থায়ী নিবাস জামালপুরে হলেও পেশাগত কারণে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কুষ্টিয়ায় অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং দুই কন্যার জনক। তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে একটি মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত এবং ছোট মেয়েটি আগামীতে মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে।

​২. শিক্ষাগত যোগ্যতা

​ড. তোজাম্মেল হোসেনের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত কৃতিপূর্ণ ও গৌরবময়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগ থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন: ​পিএইচ.ডি (২০০২): ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে “আরবী ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষাদানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান (১৯২১-১৯৯৬)” শীর্ষক গবেষণার জন্য তিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। এম.এ (১৯৯১) ও বি.এ সম্মান (১৯৯০): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগ থেকে উভয় পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন। আলিম (১৯৮৮) ও দাখিল (১৯৮৫): জামালপুরের আরাম নগর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে যথাক্রমে মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

​৩. দীর্ঘ পেশাগত ও শিক্ষকতার জীবন

​শিক্ষকতায় ড. তোজাম্মেল হোসেনের দীর্ঘ ৩১ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা তেজগাঁও কলেজে প্রভাষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের ২ নভেম্বর তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৭ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অধ্যাপক হন এবং ১ জুলাই ২০১৮ সাল থেকে তিনি ১ম গ্রেডের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

​৪. প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা

​ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ অলঙ্কৃত করেছেন:

​বিভাগীয় চেয়ারম্যান: আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ (২০১৩-২০১৬)।
​প্রভোস্ট: বেগম খালেদা জিয়া হল (২০০৮-২০০৯)।
​পরিচালক: শিক্ষক ও ছাত্র সাংস্কৃতিক কেন্দ্র – টিএসসিসি (২০০৩-২০০৬)। সহকারী প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টা: তিনি দুই মেয়াদে সহকারী প্রক্টর এবং দুই মেয়াদে বিভাগের ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।আবাসিক কমিটির সদস্য সচিব: ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবাসিক কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য (মনোনীত): মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর কর্তৃক তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর একাডেমিক কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্য হিসেবে মনোনীত হন।

​৫. শিক্ষক সংগঠন ও পেশাজীবী রাজনীতিতে নেতৃত্ব

​ড. তোজাম্মেল হোসেন শিক্ষক সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা:
​ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (ইউটাব): তিনি ২০১১ সালে এই সমিতির নির্বাচিত সভাপতি এবং ২০০৭-২০০৮ মেয়াদে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৭ বার কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন।
​বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন: ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি ৫ বার দায়িত্ব পালন করেছেন।
​জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন (ইউট্যাব ও জিয়া পরিষদ): তিনি ২০২৩ সাল থেকে ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ইউট্যাব) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি কেন্দ্রীয় জিয়া পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব এবং ইবি শাখার একাধিকবারের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন।

​৬. গবেষণা, থিসিস মূল্যায়ন ও সাহিত্য কর্ম

​একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক হিসেবে আরবী ভাষা, সাহিত্য, জাতীয়তাবাদ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক দর্শনের ওপর তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে:
​গবেষণা তত্ত্বাবধান: তাঁর অধীনে সফলভাবে গবেষণা সম্পন্ন করে ইতিমধ্যে একজন এম.ফিল এবং একজন পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং আরেকটি পিএইচ.ডি ডিগ্রি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
​থিসিস ও আর্টিক্যাল রিভিউ: দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০টি এম.ফিল/পিএইচ.ডি থিসিস এবং প্রায় ৬০টি গবেষণা নিবন্ধ তিনি মূল্যায়ন (Review) করেছেন।

​প্রকাশিত নিবন্ধ: বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর ১৯টি গবেষণা নিবন্ধ (আরবী সাহিত্য, কবি ও ইতিহাস কেন্দ্রিক) এবং ৩১টিরও বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলো বেশ প্রশংসিত। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী রচনা প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রবন্ধ জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল।

​৭. ছাত্র আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী চেতনা ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান

​ড. তোজাম্মেল হোসেনের ছাত্রজীবন থেকেই রয়েছে এক গৌরবময় রাজনৈতিক অতীত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ.এফ. রহমান হলের ছাত্রদলের সভাপতি (১৯৯৩-৯৫) এবং ডাকসু (DUCSU) নির্বাচনে প্যানেল মনোনীত প্রার্থী ছিলেন তিনি। ​শিক্ষক জীবনে এসেও তিনি শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি শুরু থেকেই সশরীরে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিবৃতির মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তার শুরু হলে তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কুষ্টিয়া সদর থানা থেকে কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের মুক্ত করে আনেন এবং তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এই সাহসী ভূমিকার জন্য তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ মামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং হিটলিস্টের ২ নম্বরে তাঁর নাম পাঠানো হয়েছিল।

​৮. বিভিন্ন নামী সোসাইটির সদস্যপদ

​তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাজীবী সংগঠনের আজীবন সদস্য, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
​বাংলা একাডেমি ​এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ , ​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, ​ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাল্যামনাই অ্যাসোসিয়েশন ।

​উপসংহার:
অধ্যাপক ড. মোঃ তোজাম্মেল হোসেন একাধারে একজন আদর্শ শিক্ষক, দক্ষ প্রশাসক, প্রাজ্ঞ গবেষক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের আধুনিকায়ন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শিক্ষক সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।