নিজস্ব প্রতিনিধি: যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবককে অমানবিক মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের বিরুদ্ধে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মূল ঘটনা ধামাচাপা দিতে ওই ইউপি সদস্য উল্টো নাটক সাজিয়েছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পাশের গ্রামের এক যুবক (ইয়াসিন আরাফাত) কাজে যাওয়ার পথে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমের মেজো ছেলে আলাউদ্দিন হোসেনের সাথে কথা-কাটাকাটি হয়। ওই যুবকের দাবি, আলাউদ্দিন তার সাথে অশালীন আচরণ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি আলাউদ্দিনকে ‘নেশাজীবী’ বলে মন্তব্য করেন। খবর পেয়ে ইউপি সদস্য সালেহা বেগম তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। তবে মীমাংসার পরপরই ইউপি সদস্য ক্ষিপ্ত হয়ে একাধিক বার গালিগালাজ করে বলতে থাকেন, এই গ্রামের একটা ছেলেও ভালো না, সবাই নেশাখোর। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় দোকানদার রবিউল ইসলাম বলেন, এমন কথা বলা ঠিক নয়, গ্রামের সবাই তো খারাপ হতে পারে না। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে একপর্যায়ে ইউপি সদস্য সলেয়া বেগম দোকানদার রবিউলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তুই কি আমাকে মারবি? এই গ্রামে কার ক্ষমতা আছে দেখি! এসময়  রবিউল এর ভাই নজরুল ইসলামের পুত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী  মোঃ নাছির হোসেন (২০) দোকানের সামনে বসে ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি নাছির স্পষ্ট কথা বলতে পারে না। ইউপি সদস্যকে বলে কাকি  সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন না। সাথে সাথে  নাছিরকে এলোপাতাড়ি মারধর ও মাটিতে ফেলে নির্যাতন চালানো হয়। পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেন দোকানদার রবিউল ইসলাম।নাছিরকে মারধরের ঘটনায় এলাকার সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সহজ-সরল ও হাসিমুখের কারণে নাছিরকে এলাকার সবাই বেশ ভালোবাসে এবং সাধ্যমতো আর্থিক সহায়তা করে থাকে। নাছিরকে অমানবিক মারপিটের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা এক জোট হয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি টের পেয়ে ইউপি সদস্য সালেয়া বেগম নিজেকে বাঁচাতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। মারামারির ঘটনার প্রায় এক মাস আগে নিজের পায়ে পাওয়া একটি পুরোনো আঘাতকে পুঁজি করে তিনি মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও থানা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ উঠেছে, আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে তিনি সাংবাদিকদের টাকা দিয়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করা চেষ্টা করেন। মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে ম্যানেজ করার কথা স্বীকারও করেছেন তিনি, যার একটি কল রেকর্ড নথি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। ইউপি সদস্য সালেয়া বেগমকে স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক ডাঃ রফিকুল ইসলাম (রফিক) চিকিৎসা প্রদান করছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করায় তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার পায়ে আঘাতের চিকিৎসা চলছিল। আমি আগেই তাকে এক্স-রে করাতে বলেছিলাম, কারণ হাড়ের ভেতরের চোটের আশঙ্কা ছিল। তবে ওই পুরোনো আঘাতকে পুঁজি করে পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে তিনি মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ছোট গ্রাম্য বাজারে যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, ঠিক পাশেই আমার চেম্বার। তবে ঘটনার দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। মারামারির বিষয়টি আমি  পরবর্তীতে শুনেছি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নাছিরকে মারপিটের দৃশ্য আড়াল করতে সালেয়া বেগমসহ ১০-১২ জন নারী মারপিটের ঘটনা ঘিরে রাখেন। পরবর্তীতে ভিডিও করা হচ্ছে বুঝতে পেরে ও স্থানীয় বিএনপির সভাপতি সহ কয়েকজন নারী ন নাছিরকে ছাড়িয়ে নেন। এরপর সালেয়া বেগমের ভাসুর ঘটনাস্থলে এসে পুনরায় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে ফোন হাতে কথা বলছিলেন হাত থেকে ফোন পড়ে গেলে  নিচু হন। এ সময় নজরুল ইসলাম তাকে দুটি কিল মারে,এবং তিনি সহ কয়েকজন মিলে নজরুল কে মারপিট করে এবং  পুনরায় সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে শুরু থেকে উপস্থিত থাকা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোঃ ইব্রাহিম হোসেন দুই পক্ষকে দুই দিকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।এ ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা (ABF)-র জেলা অফিসে মৌখিক ও পরবর্তীতে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সংস্থায় মারধরের ভিডিও ফুটেজও পাঠানো হয়। অভিযোগ পেয়ে মানবাধিকার সংস্থার জেলা ও উপজেলা অনুসন্ধানী শাখা বিষয়টি গোপনে অনুসন্ধান  করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এই ঘটনায় প্রতিবন্ধী নাছির কে অমানবিক ভাবে মারপিট করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ সহ  আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (ABF)। অভিযুক্ত  ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা পরিচালনাসহ নাছিরের পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দেয় তারা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (ABF)-র অনুসন্ধানী ইনচার্জ মোঃ রুস্তম হোসেন জানান, একজন ইউপি সদস্য আইন রক্ষা করবেন সেখানে তিনিই একজন প্রতিবন্ধী কে অমানবিক ভাবে মারপিট করেছেন। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৬১ নং আইন, ধারা ৩৪: ঘ) অনুযায়ী উক্ত ইউপি সদস্যের সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণের দাবি জানিয়ে আদালতে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আবেদন পাঠানো হবে। এ বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সম্রাট হোসেন জানান, “ঘটনার দিন ইউপি সদস্য সালেয়া খাতুন আমাকে ফোনে মৌখিক অভিযোগ করে জানান যে তাকে মারধর করা হয়েছে এবং এতে তার পায়ে ইনজুরি হয়েছে। আমি তাকে লিখিত অভিযোগ দিতে বললে তিনি একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। অভিযোগটি মণিরামপুর থানার ওসিকে পাঠিয়ে তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারধরের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। নাছিরের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে এবং তদন্তে ইউপি সদস্য দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্য জানান প্রতিবন্ধী নাছিরকে মারপিট করিনাই, ঘটনা সম্পুর্ণ মিথ্যা। আমাকে তারা মেরে পারে ভেঙে দিয়েছে আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর দরখাস্ত দিয়েছি আশা করি আমার উপরে হামলাকারীরা গ্রেফতার হবে।

এবিষয়ে ২নং কাশিমনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক, উপজেলা মৎস্য অফিসার সেলিম রেজা জানান আমাকে মহিলা ইউপি সদস্য  সালেয়া খাতুন মোবাইলফোনে তাকে মারপিট করে পারে ভেঙে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে অবগত করি।ইউপি সদস্য সলেয়া খাতুন লিখিত অভিযোগ করেন,বর্তমান সেটা তদন্ত করছেন পুলিশ। তার আগে থেকে পায়ে ইনজুরি  সহ   প্রতিবন্ধী নাছির কে মারপিট করার কথা আমি জানতাম না,এমন অমানবিক ঘটনা কথনো সমার্থন যোগ্য নয়।

এই ঘটনার সঠিক তদন্ত মূলক,আইনি পদক্ষেপ  ও প্রতিবন্ধী কে অমানবিক ভাবে মারপিট করায় চাচা মোঃ নজরুল ইসলাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত  দরখাস্ত দিয়েছেন।