নিজস্ব প্রতিনিধিঃ মাদারীপুরের মেয়ের ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নড়াইল থেকে পাসপোর্ট তৈরি করে বৈধ পথেই ভারতে পাচারের পায়তারা করা হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার চৌরাসী গ্রামের কালু বাড়ৈ ও ববিতা বাড়ৈ মেয়ে দশম শ্রেণি পড়ুয়া সমাপ্তী বাড়ৈ(১৪) নামের এক নারীকে নড়াইল জেলায় এনে লুকিয়ে রেখে জাল নথিপত্র বানিয়ে ভারতে পাচারের পায়তারার তথ্য প্রমাণ মিলেছে একটি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। এই চক্রের সাথে ভারত থেকে আগত বাপ্পি রায় ওরফে আবির নামের এক যুবকের সম্পৃক্ততারও সত্যতা মিলেছে সাংবাদিকদের কাছে।
ঘটনা অন্তরালের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে মানবপাচারকারী চক্রের লম্বা ফিরিস্তি। এই চক্রের সাথে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় নিযুক্ত একাধিক ব্যক্তি। শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ গ্রামের দুর সম্পর্কের কাকা অশোক রায়ের বাড়িতে বেড়াতে আসে ভারত থেকে বাপ্পি রায় ওরফে আবির নামের এক যুবক। অশোক রায়ের ছেলে সুব্রত রায়ের সাথে থেকে ভারতীয় যুবক আবির অনলাইনে যোগাযোগ হওয়া মাদারীপুরের সমাপ্তীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নড়াইলে এনে সুব্রত রায়ের বাড়িতে আশ্রয় দেয়। এরপরে পাসপোর্ট করার জন্য মেয়ের নাম ঠিক রেখে বাবা-মায়ের নামের জায়গায় দেবভোগ গ্রামের প্রসেন রায় ও বিথীকা রাণী রায় দম্পতির এনআইডি ব্যবহার করে জন্ম নিবন্ধন তৈরিতে সহযোগিতায় মিঠু রাণী ভদ্র নামের এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে সত্যতার জবানবন্দি দিয়েছে তারই আপন বোনের ছেলে নড়াইল শহরের ইউনাইটেড কম্পিউটারের স্বত্বাধিকারী অনলাইনে এক্সপার্ট নথিপত্র জালের মূলহোতা এবং পাসপোর্ট অফিসের দালাল কৌশিক দাস রায়। এরপরে বেরিয়ে আসে সমাপ্তী বাড়ৈকে রুপসী রায় করা সহ সকল নকল ডকুমেন্টস রাষ্ট্রীয় ভাবে অনুমোদন করিয়ে দেওয়া চক্রের তথ্য। এই চক্রের মুলহোতা বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্দোক্তা নাঈম হোসেন ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মান্নানের যোগসাজশে ডিজিটাল জন্ম-নিবন্ধন তৈরি করার মতো একটি গুরুতর অপরাধের চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। শেখহাটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন নেওয়ার রাষ্ট্রীয় নিয়ম থাকলেও সেটাকে চক্রান্ত করে সম্পূর্ণ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বাওউসোনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ডিজিটাল এই জন্ম নিবন্ধন প্রাপ্তির মূলহোতা উদ্দোক্তা নাঈম হোসেনকে সহযোগিতায় রয়েছে বাওইসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মান্নান। যার সত্যতাও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এসেছে। একজন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও উদ্দোক্তা চাইলেই যে এতবড় অনিয়ম ও দুর্নীতি করতে পারে সেটা এই অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।
মানবপাচারকারী চক্রের এই ঘটনায় প্রথম নয় এমন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
উল্লেখ্য যে, মাদারীপুরের সমাপ্তী বাড়ৈ তার পরিবারের কাছে দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস যাবৎ নিখোঁজ আছে। এতথ্য নিশ্চিত করেছে তার অরিজিনাল বাবা কালু বাড়ৈ ও মাতা ববিতা বাড়ৈ।
উল্লেখ্য যে, খোজাখুজির পর একপর্যায়ে কোন হদিস না পেয়ে সমাপ্তী বাড়ৈর পিতা কালু বাড়ৈ রাজৈর থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে এবং পাচারকারী চক্রের হাতে সমাপ্তী বাড়ৈ জিম্মি আছে উল্লেখ করে একটি অভিযোগ করেছেন। এব্যাপারে জানতে চাইলে নিখোঁজ সমাপ্তীর বড় বোন জামাই বলেন, আমাদের নাবালিকা মেয়েকে ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ভারত থেকে আগত আবির নড়াইলের কিছু লোকের সহযোগিতায় অপহরণ করেছে এবং সমাপ্তীকে ভারতে পাচারের পায়তারা চালাচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। পুলিশ ও সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ সাপোর্ট আশা করছি আমরা।
এব্যাপারে জানতে চাইলে রাজৈর থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ আমিনুল ইসলাম অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমরা এব্যাপার তদন্ত শুরু করেছি খুব শীঘ্রই এই পাচারকারী চক্রের শিকড় টেনে তুলব।
অভিযোগের তদন্তকারী রাজৈর থানার এসআই সজিব বলেন, মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে পেরেছি, কিন্তু ভিকটিম অন্য জেলায় হওয়ার কারণে এবং নিশ্চিত লোকেশন না পাওয়ার কারণে একটু বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুত অপরাধী চক্র আইনের জালে ধরা পড়বে। তিনিও সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
নড়াইল জেলার দৈনিক দিনকালের প্রতিনিধি ও রুর‍্যাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন(আরজেএফ) এর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মোঃ সাজ্জাদ আলম খান সজল বলেন, আমাদের একটা টিম দীর্ঘদিন ধরে এই মানব পাচারকারী চক্রের তথ্য অনুসন্ধানে মাদারীপুরের নিখোঁজ সমাপ্তী বাড়ৈ সম্পর্কে অনেক তথ্য প্রমাণ হাতে পেয়েছে। এই চক্রের জড়িয়ে আছে রাষ্ট্র নিযুক্ত একাধিক ব্যক্তি। তা-না হলে সমাপ্তী বাড়ৈকে নড়াইলে একে রুপসী রায় বানানো এতোটা সহজ নয়। যার পাসপোর্ট পর্যন্তও হাতে পেয়ে গেছে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। একটা অন্য জেলার ১৪ বছরের মেয়ের নাম-ঠিকানা পরিবর্তন করে একাধিক নথিপত্র জাল করে পাসপোর্ট তৈরি করতে তাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। আমরা প্রশাসনের সাথে সহযোগিতা করে এই চক্রকে নির্মূল করতে চাই।