কল্যান রায় জয়ন্ত: পবিত্র মাহে রমজান শুরু হতেই যশোরের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, তেল ও মশলাসহ অধিকাংশ পণ্যের দামে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হঠাৎ এ মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। বাজার করতে গিয়ে অনেকেরই নাভিশ্বাস উঠছে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) শহরের বড়বাজারসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজানের আগে যে সবজি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা ৬০-৮০ টাকায় উঠেছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৮০ টাকার কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকায়। ৫০ টাকার শসা ১২০-১৪০ টাকা, ৫০-৬০ টাকার বেগুন ৮০-১০০ টাকা, আবার কোথাও ১২০ টাকা কেজি। প্রতি হালি কাগুজী লেবু ৩০ টাকার পরিবর্তে ৫০-৮০ টাকা, ৩০ টাকার টমেটো ৫০ টাকা, ২৫ টাকার সিম ৪০ টাকা, পাতা কপি ২০ টাকা পিস, গাজর ৪০-৬০ টাকা এবং ৩০ টাকার লাউ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাকা কলা ছড়া ৮০ টাকা।

মুরগি ও মাংসের বাজারেও একই চিত্র। দেশি মুরগি কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ৬০০ টাকা, ব্রয়লার ১৯০-২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা। ৬৫০ টাকার গরুর মাংস এখন ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি। মাছের বাজারে রুই ২৮০-৩৮০ টাকা, তেলাপিয়া ১৮০-২২০ টাকা, পাঙ্গাস ২০০-২৬০ টাকা, চিংড়ি ৬০০ থেকে ১ হাজার ৪শ টাকা কেজি। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী। লেয়ার মুরগির ডিম প্রতি হালি ৪০ টাকা, দেশি হাঁসের ডিম ৭০-৮০ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ৮০-১০০ টাকা। ১৯০ টাকার সয়াবিন তেল ২১০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মশলার দামও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বাজারে নিম্নমানের খেজুরের আধিক্য থাকলেও দাম চড়া। ভালো মানের খেজুর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

বাজার করতে আসা ভ্যানচালক আসলাম আলী বলেন, যে হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। কীভাবে বাজার করবো বুঝতে পারছি না।

আনোয়ার হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, রমজানের আগে যে দাম ছিল, দু’দিনের মধ্যে তা হু-হু করে বেড়ে গেছে। অন্য দেশে রোজা এলে দাম কমে, আর আমাদের দেশে বাড়ে। বাজার মনিটরিং থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।

ঘোপ বেলতলার রনি হোসেন বলেন, রমজান এলেই বাজারে আগুন লাগে। সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

তরকারি বিক্রেতা নাজিম হোসেন জানান, তিনি ১১১ টাকা কেজি দরে শসা কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন। আলামিন নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, ৬২ টাকা কেজি দরে বেগুন কিনে ৮০ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে একই বাজারে বেগুন ১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। বিক্রেতা সোহেল বলেন, আড়ৎ থেকে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম বাড়াতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আড়ৎ পর্যায়ে দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারে কম দামে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না।

ক্রেতাদের অভিযোগ, যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অসাধু ব্যবসায়ীরা রমজানকে কেন্দ্র করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। অনেক দোকানে মূল্য তালিকা টানানো নেই, ফলে ইচ্ছামতো দাম নেওয়া হচ্ছে। রমজানজুড়ে কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। সচেতন মহল নিয়মিত বাজার তদারকি, প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে রমজান শুরুর আগের দিন অধিক দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে বিশেষ টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করা হয়। মনিহার ও পালবাড়ী এলাকায় তিনটি দোকানে অভিযান চালিয়ে মোট ৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। মনিহার ফলের বাজারের ‘নওরিন ফ্রুটস’-এ ক্রয়-বিক্রয় স্লিপ না থাকায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৫ ধারায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পালবাড়ীর ইনকিলাব স্টোরে মূল্যতালিকা না থাকায় ২ হাজার টাকা এবং একটি মাংসের দোকানে একই ধারায় ১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে জানান জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।