৯ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১২টা। ঢাকার সাভার ব্যাংক টাউনে থাকেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সিঙ্গাপুর প্রবাসী ফুফাতো ভাই ওমর ফারুককে বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে বাসা থেকে বের হন তিনি। মামুন আর ফারুক বিমানবন্দরে যেতে ব্যাংক টাউনের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাস থামান। তাদের কাছে বিমানবন্দরের ভাড়া ২০০ টাকা ভাড়া চান বাসের হেলপার। ১৫০ টাকায় ভাড়া ঠিক করে উঠে পড়েন তারা। ওঠার পরই বাসের দরজা লক করে দেন হেলপার। ভিতরে যাত্রীবেশে থাকা সবাই ছিল ডাকাত। তাদের কাছে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ, ব্যাংকের এটিএম কার্ডও ছিনিয়ে নেয়। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে ওমর ফারুকের কাছ থেকে পিন নম্বর নিয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ডে ইসলামী ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে ৩৮ হাজার টাকা তুলে নেয়। পৌনে ১ ঘণ্টা বিভিন্ন সড়কে ঘুরিয়ে জমজম হাউজিং এলাকায় ফেলে চলে যায় ডাকাতরা। পরদিন সাভার থানায় উপস্থিত হয়ে ঘটনা জানালে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিয়ে মামুনকে ফিরিয়ে দেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম।

গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ঢাকা ও আশপাশের অন্তত চারটি রুটে ডাকাতির রাজত্ব করে আসছিল অন্তত ৩৭ জন। যাদের শনাক্ত করতে পেরেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রত্যেকটি ডাকাতির ঘটনায় দিলীপ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। রুটগুলোর মধ্যে প্রথম রুট হলো- টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও মির্জাপুর থেকে কালিয়াকৈর, কবিরপুর, বাইপাইল, নবীনগর, সাভার, হেমায়েতপুর, গাবতলী, কেরানীগঞ্জ, পোস্তগোলা হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। দ্বিতীয় রুট- গাবতলী, হেমায়েতপুর, গেন্ডা, সাভার থেকে নবীনগর, বাইপাইল, আশুলিয়া, কবিরপুর, চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, ভোগড়া হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। তৃতীয় রুট- গাবতলী, আমিনবাজার, হেমায়েতপুর থেকে গেন্ডা, সাভার, নবীনগর, ধামরাই, কামালপুর হয়ে মানিকগঞ্জ। চতুর্থ রুট- উত্তরা, গাজীপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিহ্নিত ডাকাত সদস্যরা প্রত্যেকেই রূপগঞ্জের চনপাড়ায় অবস্থান নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- এখান থেকে তাদের ডাকাতির কার্যক্রম শুরু হতো।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শাহাদাত হোসেন সুমা জানান, আশুলিয়ার একটি ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ওইসব ডাকাতকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন তারা। প্রত্যেকের নামেই আগের ডাকাতি, খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ওই চারটি রুটে তারা ডাকাতি করে আসছিল। চারটি দলে ভাগ হয়ে এসব রুটে ডাকাতি করা হতো।

ডাকাতির ঘটনা জেনেও ধামাচাপা দিত থানা পুলিশ : গত ৯ জানুয়ারি সাভারে ডাকাতের কবলে পড়লেও গত ৪ ফেব্রুয়ারি আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছ থেকে মামলা নিয়েছে সাভার থানা পুলিশ। প্রায় এক মাস পর মামলা হওয়ার বিষয়ে কথা হয় ভিকটিম মামুনের সঙ্গে। তিনি এ  বলেন, জমজম হাউজিং থেকে নিজেরা অনেক কষ্টে হাতের বাঁধন খুলি। এরপর রাস্তায় একটা পুলিশের টহল টিম দেখতে পাই এবং তাদের ঘটনাটি জানাই। তারা উল্টো আমাদের বলেন- এত রাতে বাসে উঠতে যান কেন। পরদিন থানায় গেলে ওসি সাহেব ঘটনা জেনে বলেন- একটা জিডি করে চলে যান। এ বিষয়ে জানতে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। সে সময় মামলা না নেওয়ার বিষয়ে কারণ জানতে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।

গত ২০ জানুয়ারি বন্ধুর সঙ্গে ঢাকা থেকে কর্মস্থল টাঙ্গাইলে রওনা হন ডা. শফিকুল ইসলাম। রাত সাড়ে ১২টায় রাজধানীর আবদুল্লাহপুর থেকে ওঠেন ঢাকা-রাজশাহী-চাপাই রুটের একটি বাসে। মিনিট ১৫ পর তারা বুঝতে পারেন যাত্রীবেশে থাকা বাসের অধিকাংশই ডাকাত। রাতভর রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে যাত্রী তোলে বাসটি। মারধর করে তাদের কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেয় যাত্রীবেশী ডাকাতরা। পরে ওই চিকিৎসককে নামিয়ে দেওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে। ভুক্তভোগী সেই চিকিৎসক জানিয়েছেন, প্রথমে যাত্রাবাড়ী থানায়, পরে উত্তরা পশ্চিম থানায় অভিযোগ জানাতে যান তিনি। কিন্তু আবদুল্লাহপুর থেকে বাসে ওঠায় এবং যাত্রাবাড়ীতে বাস থেমেছে এমন অজুহাতে মামলা নেয়নি পুলিশ। এ নিয়ে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ক্ষোভ আর কষ্টের কথা জানান সরকারি এই চিকিৎসক।

এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর ঢাকার আশুলিয়া কবিরপুরে ২০-৩০ জন ডাকাতের কবলে পড়ে একটি বাস। চালক-হেলপারকে মারধর করে হাত-পা বেঁধে রেখে বাসটি নিয়ে ডাকাতি করতে থাকে দুর্বৃত্তরা। ডাকাতি শেষে বাসসহ চালক-হেলপারকে কালিয়াকৈরে ফেলে যায়। বাসচালক জুয়েল এ প্রতিবেদককে জানান, তার বাসে এক মহিলা ছিলেন। ডাকাতরা তার ৪০ হাজার টাকা নিয়ে নেয়। তারা ডাকাতির ঘটনাটি কালিয়াকৈর থানায় জানালেও মামলা নেয়নি পুলিশ। তারা আশুলিয়া থানায় মামলা করতে পাঠালেও সেখানেও মামলা হয়নি। ডিবি পুলিশের হাতে ডাকাতরা গ্রেফতার হলে গতকাল (৫ জানুয়ারি) মামলা নিয়েছে আশুলিয়া থানা। ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিমুল এহসান বলেন, ডাকাতির ঘটনায় জিডি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ডাকাতি হলো একটি অপরাধ। যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা মামলা হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে।

গ্রেফতার প্রত্যেকে পুরনো ডাকাত : গ্রেফতার দিলীপ ওরফে সোহেল। তিনি ডাব বিক্রির আড়ালে ডাকাতির পরিকল্পনা করতেন। তিনি দুটি বিয়ে করেছেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে তিনি মুসলমান হন।

ডিবি পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মানিকগঞ্জের শিবালয় থানায় তার নামে ডাকাতিসহ হত্যা মামলা রয়েছে। আবু জাফর ওরফে বিপ্লবের নামে ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া সদর থানায় ডাকাতির মামলা হয়। ২০২১ সালের ২৭ জুন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে একটি মাদক মামলা হয়। ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকার সাভার থানায়ও তার নামে মাদক মামলা হয়। ২০১৬ সালের ঢাকার আশুলিয়া থানায় তার নামে একটি জোড়া খুনের মামলা রয়েছে। আল আমিনের নামে ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অস্ত্র আইনে এবং ডাকাতির মামলা হয়।

তার বিরুদ্ধে সাভার থানায় ২০২০ সালের ব্যবসায়ী রবিউল লস্কর হত্যা মামলাও রয়েছে। রফিকুল ইসলামের নামে ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানায়, একই বছরের ৩ জুলাই সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানায় ডাকাতির মামলা হয়। ২০১৯ সালের ১ জুলাই আশুলিয়া থানায় মাদক মামলা হয় এবং ১৩ ডিসেম্বর আরেকটি মামলা হয়। ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর ডাকাতির মামলা হয়। গ্রেফতার আরেক আল আমিনের নামে ২০১৬ সালের ৭ জুন মানিকগঞ্জের শিবালয় থানায় খুনের মামলা হয়। নাইমুর রহমান ওরফে নাঈমের নামে ঢাকার ডেমরা থানায় ২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর মাদকের মামলা হয়। সজিব মিয়ার নামে গত বছরের ২৯ এপ্রিল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থানায় একটি মামলা হয়। শাহনেওয়াজ ভূইয়া আজাদের নামে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ সদর থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়। আলমগীর প্রধানের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানায় মাদকের মামলা হয়। রাসেল আকন্দের বিরুদ্ধে গত ১৬ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় একটি ডাকাতির মামলা হয়েছিল। নাইম হোসেন, আবদুল মজিদ, মজিদুল ইসলামের বিরুদ্ধেও একই থানায় একই দিন মামলা হয়। গত ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় সেকান্দার আলীর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। একই দিন একই থানায় সাগর আলীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে গাজীপুর মহানগরের কাশিমপুর থানায় ২০২০ সালের ২৩ জুন একটি মাদক মামলা হয়। এদের গত ৩০ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।

এদের মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি দিলীপ, ৪ ফেব্রুয়ারি আল আমিন ও নাইমুর আদালতে ডাকাতির কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, এসব ডাকাত ঢাকার বাইরে বেশি ডাকাতি করত। ঢাকার বাইরে মামলা না হওয়ার কারণে এদের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। এখন মামলা বেশি নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা ডাকাতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। যে কারণে জামিনে বেরিয়েই আবারও ডাকাতি শুরু করে।

 

কলমকথা/বি সুলতানা