উত্তর, মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুড়ছে। দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রসহ অন্তত ১০টি রাজ্যে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে বা তারও বেশি থাকতে পারে। দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। বহু এলাকায় সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও জীবিকার তাগিদে সাধারণ মানুষকে বের হতেই হচ্ছে।

আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতে এখনই বৃষ্টির সম্ভাবনা খুব কম। ফলে আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং দীর্ঘদিনের খরার কারণে এ বছরের গরম অতীতের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তর প্রদেশে। সেখানে কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বান্দায় বুধবার সর্বোচ্চ ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এলাহাবাদে ৪৬ দশমিক ৪, হামিরপুরে ৪৬ দশমিক ২ এবং ঝাঁসিতে ৪৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। আলিগড়, বারাণসী ও হারদইসহ একাধিক জেলার তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রির ওপরে রয়েছে। তীব্র গরমে উত্তর প্রদেশের স্বাভাবিক জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুপুরের পর বহু এলাকায় বাজার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আলিগড়ের বড় ব্যবসাকেন্দ্রগুলিতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হতো, এখন তা নেমে এসেছে কয়েক লাখ টাকায়। বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রীরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মাথা ঘোরা, বমি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।

রাজস্থানেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শ্রীগঙ্গানগরে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দুপুরের পর শহরের রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে। পশুপাখিদের বাঁচাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। চিড়িয়াখানার খাঁচাগুলিতে কুলারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে।এদিকে রাজধানী নয়াদিল্লিতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রবল গরমে সঞ্জয় লেকের মাছ মরে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী শীতলকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পানীয় জল, খাবার স্যালাইন ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গৃহহীন ও শ্রমজীবী মানুষ এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছেন।

পাহাড়ি এলাকাতেও এবার গরমের তীব্রতা নজিরবিহীন। দেরাদুন, হরিদ্বার ও হৃষিকেশের মতো জায়গায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। হিমাচল প্রদেশের উনাতেও তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরাঞ্চলে কংক্রিটের রাস্তা, বহুতল ভবন এবং গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। দিনে শহর তাপ শোষণ করছে, রাতে সেই তাপ বের হওয়ায় রাতেও স্বস্তি মিলছে না। একে বলা হচ্ছে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব।

চিকিৎসকরা দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা পোশাক ব্যবহার, ছাতা বা টুপি সঙ্গে রাখা এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।