
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত এই চুক্তি নিয়ে নয়াদিল্লির একাংশ এখন প্রশ্ন তুলছে। তাদের দাবি, ১৯৬০ সালের এই চুক্তি শুরু থেকেই ছিল অসম, যেখানে ভারতকে বেশি সংযম দেখাতে হয়েছে এবং পাকিস্তান তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি অনুযায়ী, রাভি, বেয়াস ও শতদ্রু—এই তিন পূর্বাঞ্চলীয় নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার পায় ভারত।
অন্যদিকে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব—এই তিন পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীর অধিকাংশ পানির অধিকার পায় পাকিস্তান। পানির পরিমাণের হিসেবে পাকিস্তানের ভাগে যায় প্রায় ৮০ শতাংশ, আর ভারতের ভাগে থাকে প্রায় ২০ শতাংশ।
ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের দাবি, উজানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারত এই চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছিল। শুধু পানি বণ্টনেই নয়, পাকিস্তানে পানি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ভারত আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে প্রায় ৬২ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দেওয়া হয়, যা চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নয়াদিল্লির অভিযোগ, ভারত দীর্ঘদিন চুক্তির প্রতি আনুগত্য দেখালেও পাকিস্তান বারবার চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে ভারতের উন্নয়ন প্রকল্প ঠেকানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। বাগলিহার, কিশনগঙ্গা, পাকাল দুল ও তুলবুলসহ একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তির কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
ভারতের দাবি, এসব প্রকল্প চুক্তির আওতায় বৈধ হলেও পাকিস্তান কৌশলগতভাবে আপত্তি জানিয়ে কাজ বিলম্বিত করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরেও এই চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, নিজেদের ভূখণ্ড দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ও জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারায় অঞ্চলটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, চুক্তিটি পারস্পরিক সুবিধার কাঠামো না হয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভারতের জন্য সীমাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের বক্তব্য, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাত কিংবা মুম্বই হামলার মতো বড় ঘটনার পরও ভারত চুক্তি মেনে চলেছে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় চুক্তির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সিন্ধু পানি চুক্তি শুধু দুই দেশের পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ভারতের নতুন অবস্থান পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়ালেও, বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লির এই অবস্থান সরাসরি আগ্রাসন নয়; বরং দীর্ঘদিনের অসম বাস্তবতা পুনর্বিবেচনার চেষ্টা। তবে পাকিস্তান বিষয়টিকে কূটনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে। ফলে সিন্ধু চুক্তি আগামী দিনে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কিত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
ডেইলি কলমকথার সকল নিউজ সবার আগে পেতে গুগল নিউজ ফিড ফলো করুন
দৈনিক কলম কথা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।