বিটিভির একটি লোগোর সঙ্গে আমার শৈশব, একটি প্রজন্ম এবং একটি দেশের স্মৃতি

একটি লোগোর জন্য মানুষের চোখ ভিজে যেতে পারে?

আজকের দিনে প্রশ্নটা হয়তো একটু অদ্ভুত শোনায়। এখন প্রতিদিন কত প্রতিষ্ঠানের লোগো বদলায়। রং বদলায়, অক্ষর বদলায়, নকশা বদলায়। নতুন প্রজন্ম হয়তো কয়েক দিন পর পুরোনোটাই ভুলে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই লাল সবুজের লোগোটি কি শুধু একটি লোগো?

আমার কাছে নয়।

আমার মনে হয়, সত্তর ও আশির দশক পেরিয়ে আসা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের কাছেও নয়।

বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের খবর পড়ার পর থেকেই আমি বারবার ফিরে যাচ্ছি চুয়াডাঙ্গায়। আমার শৈশব ও কৈশোরের শহরে। পুরাতন হাসপাতালপাড়ায়। ভিক্টোরিয়া জুবিলি (ডিজে স্কুল) এর পাশে।

তখন আমাদের পাড়ায় কোনো টেলিভিশন ছিল না।

আজকের শিশুর কাছে এই কথাটি বোঝানো কঠিন। তার হাতে মোবাইল ফোন। এক আঙুলের স্পর্শে পৃথিবীর হাজার চ্যানেল। অথচ আমরা এমন এক সময়ের শিশু, একটি টেলিভিশন দেখার জন্য দল বেঁধে অন্যের বাড়িতে যেতাম।

আমার বন্ধু জাকিরের বাবা প্রথম একটি টেলিভিশন কিনে আনলেন। তাদের বাড়িটিকে সবাই বলত ‘জমিদার বাড়ি’।

সেই টেলিভিশন আসা যেন শুধু একটি পরিবারের ঘটনা ছিল না। পুরো পাড়ার ঘটনা।

তখন টেলিভিশনের জন্য লাইসেন্স করতে হতো। টিভি ছিল বড় সম্পদ, বড় বিস্ময়। আর যেখানে টেলিভিশন ছিল, সন্ধ্যায় সেই বাড়ির চারপাশে মানুষের আনাগোনাও ছিল বেশি।

আমরা শিশুরা দল বেঁধে যেতাম।

কিন্তু একটি বাড়ির টেলিভিশন দিয়ে তো গোটা এলাকার মানুষের সাধ মেটে না।

এরপর চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা একটি টেলিভিশন নিয়ে এলো।

পৌরসভা অফিসের সামনে বিশাল খোলা মাঠ। সেখানে রাখা ১৪ ইঞ্চির একটি সাদা কালো টেলিভিশন। পর্দাটা পরিষ্কার ছিল না। ছবি ঝিরিঝিরি করত। কখনো মানুষ দেখা যেত, কখনো শুধু দাগ। তবুও সেই টেলিভিশনের সামনে কী ভিড়!

বৃহস্পতিবার রাত আমাদের কাছে ছিল উৎসবের রাত।

‘ছায়াছন্দ’ হবে।

সিনেমার গান দেখানো হবে।

আমরা দল বেঁধে ছুটতাম পৌরসভার মাঠে। কারও হাতে মোবাইল ছিল না, ঘড়ি ছিল না, রিমোট কন্ট্রোলের প্রশ্নই আসে না। কিন্তু কখন অনুষ্ঠান শুরু হবে, অদ্ভুতভাবে আমরা সবাই জানতাম।

মাঠে বসে ঝিরিঝিরি পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

আজ কোটি পিক্সেলের পর্দায় যে আনন্দ পাই না, সেই অস্পষ্ট ১৪ ইঞ্চি সাদা কালো পর্দায় হয়তো তার চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিলাম।

তারপর আমাদের বাড়ির পাশেই টেলিভিশন কিনলেন মনি চাচা।

পুরো নাম অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান। রাশিয়া থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে দেশে ফিরেছিলেন।

সেই টেলিভিশন আমাদের জন্য আরেক আকর্ষণ।

বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়ার পথে তাদের বাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দিতাম। কখনো ইংরেজি সিরিয়াল চলছে। ভাষা কতটুকু বুঝতাম জানি না। কিন্তু ছবিগুলো দেখলেই যেন অন্য একটি পৃথিবীর দরজা খুলে যেত।

বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকতেন মনি চাচার বাবা।

আমরা তাঁকে দাদা ডাকতাম।

দাদা আমাদের জানালা দিয়ে উঁকি দিতে দেখলেই বকা দিতেন।

আমরা ছুটে পালাতাম।

কিছুক্ষণ পর আবার আসতাম।

আবার জানালায় মুখ।

আবার বকা।

আবার দৌড়।

শৈশব সম্ভবত এমনই। যেখানে বকাও স্মৃতি হয়ে যায়।

আজ এত বছর পর সেই দাদার বকাও মনে পড়লে মায়া লাগে।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য অনুভূতিটা হতো নিজের বাড়িতে বসে পড়ার সময়।

বই সামনে খোলা। পড়ছি।

হঠাৎ মনে হতো, এখন বিটিভির অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে।

চোখের সামনে ভেসে উঠত সেই পরিচিত প্রতীক।

সবুজের মধ্যে লাল সূর্য। তার নিচে শিল্পীর হাতে লেখা ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’।

সঙ্গে সেই সুর।

ব্যস।

পড়ায় আর মন বসত না।

বুকের ভেতরটা উথাল পাতাল করে উঠত।

মনে হতো বই বন্ধ করে এখনই ছুটে যাই। কোনো টেলিভিশনের সামনে গিয়ে বসি।

একটা লোগো, একটা সুর, একটা শিশুকে তার পড়ার টেবিল থেকে টেনে নিয়ে যেতে পারে, এর চেয়ে বড় ব্র্যান্ডের শক্তি আর কী হতে পারে?

কিন্তু বিটিভির ওই প্রতীককে ‘ব্র্যান্ড’ বললেও যেন ছোট করা হয়।

কারণ এর জন্ম স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িয়ে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের নিজস্ব পরিচয় প্রয়োজন হয়েছিল। সেই পরিচয়ের নকশা তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন এ দেশের শিল্পকলার ইতিহাসের বড় বড় নাম। জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, ইমদাদ হোসেনসহ একদল শিল্পীর ভাবনায় তৈরি হয়েছিল প্রতীকটি। 

সবুজ ফ্রেমের মধ্যে একটি টেলিভিশন পর্দা।

ভেতরে উদীয়মান লাল সূর্য।

এ যেন একটি স্বাধীন দেশের নতুন ভোর।

এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় পতাকার রঙের সম্পর্কও চোখ এড়ায় না।

মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে লেখা ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ নামটিও সাধারণ কোনো টাইপফেস নয়। এটিও সেই প্রতীকের শিল্পমূল্যের অংশ।

১৯৮০ সালে যখন বাংলাদেশ টেলিভিশন রঙিন সম্প্রচারে প্রবেশ করল, সেই পরিচিত প্রতীকটিও রঙিন যুগের উপযোগী রূপ পেল। 

কিন্তু তার আত্মা বদলায়নি।

আমাদের সময় বিটিভি শুধু টেলিভিশন ছিল না।

ছিল পরিবারের বৈঠকখানা।

পাশের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের একটা কারণ।

একসঙ্গে আনন্দ পাওয়ার জায়গা।

আজ একটি পরিবারের পাঁচজন পাঁচটি পর্দায় পাঁচটি আলাদা জিনিস দেখে। আমাদের সময় একটি পর্দার সামনে পাঁচ পরিবারও বসেছে।

কেউ মেঝেতে।

কেউ মোড়ায়।

কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

কেউ হয়তো বাইরে থেকে ঘাড় বাড়িয়ে দেখছে।

আর নাটক শুরু হলে বাড়ি নিস্তব্ধ।

সেই নাটকও কেমন ছিল!

‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, পরে ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, আরও কত সৃষ্টি মানুষের জীবন আর ভাষার অংশ হয়ে গেছে। বিটিভির নিজস্ব আর্কাইভেও ‘এইসব দিনরাত্রি’কে আশির দশকের দর্শকপ্রিয় ধারাবাহিক হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। 

সেই সময় নাটক মানেই শুধু বিনোদন ছিল না।

একটা পরিবার একসঙ্গে বসে দেখার মতো গল্প ছিল।

বাবা দেখতেন।

মা দেখতেন।

ছেলে মেয়ে দেখত।

দাদা দাদি, নানা নানি দেখতেন।

একই সংলাপে সবাই হাসত।

একই দৃশ্যে সবার চোখ ভিজত।

পরদিন স্কুলে, অফিসে, বাজারে, চায়ের দোকানে সেই নাটকের কথা হতো।

একটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এত গভীরভাবে একটি জাতির সামাজিক জীবনে ঢুকে যেতে পারে, সেই সময়ের বিটিভি তার উদাহরণ।

এখন বলা হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে বিটিভির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অবশ্যই করতে হবে।

বিটিভি আধুনিক হোক।

আরও সাহসী হোক।

আরও স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য হোক।

নাটক ভালো হোক।

সংবাদ ভালো হোক।

ডকুমেন্টারি ভালো হোক।

গ্রাফিকস বদলাক।

স্টুডিও বদলাক।

প্রযুক্তি বদলাক।

প্রয়োজনে পুরো পর্দার চেহারা বদলে যাক।

বিটিভি কর্তৃপক্ষও বলছে, লোগো পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত নয় এবং নতুন প্রজন্মের ভাবনা জানতেই নকশা আহ্বান করা হয়েছে। 

সেটা স্বস্তির কথা।

কারণ আধুনিকীকরণ আর স্মৃতি মুছে ফেলা এক জিনিস নয়।

বিবিসি তাদের ভিজ্যুয়াল পরিচয় বহুবার পরিমার্জন করেছে। বিশ্বের বহু পুরোনো প্রতিষ্ঠানই করে। কিন্তু ঐতিহাসিক পরিচয়ের মূল সূত্র ধরে রাখে।

বিটিভিও পারে।

লোগোটিকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করা যেতে পারে।

রেখা আরও পরিচ্ছন্ন করা যেতে পারে।

রঙের ব্যবহার আধুনিক করা যেতে পারে।

ছোট পর্দা, মোবাইল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা প্রয়োগ হতে পারে।

কিন্তু সেই লাল সূর্যটা কেন হারাবে?

সেই সবুজ পর্দাটা কেন হারাবে?

মুস্তাফা মনোয়ারদের হাতের ছাপ কেন মুছে যাবে?

সবকিছুকে নতুন করতে হয় না।

কিছু জিনিসকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

কারণ একটি রাষ্ট্র শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে গড়ে ওঠে না। রাষ্ট্রেরও স্মৃতি থাকে।

একটি জাতিরও শৈশব থাকে।

আমাদের সেই শৈশবের একটি অংশ বিটিভি।

আজ আমার চোখের সামনে আবার সেই চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মাঠ।

১৪ ইঞ্চির টেলিভিশন।

ঝিরিঝিরি ছবি।

বৃহস্পতিবার রাত।

আমরা একদল শিশু দৌড়ে যাচ্ছি ‘ছায়াছন্দ’ দেখতে।

আবার মনে পড়ছে মনি চাচাদের বাড়ির জানালা।

আমরা উঁকি দিচ্ছি।

দাদা বকা দিচ্ছেন।

আমরা পালাচ্ছি।

আবার ফিরে আসছি।

তারপর মনে পড়ছে পড়ার টেবিল।

বই খোলা।

কিন্তু মন পড়ে আছে টেলিভিশনের পর্দায়।

মনে হচ্ছে এখনই সেই সুর বাজবে।

এখনই উদিত হবে লাল সূর্য।

এখনই লেখা উঠবে, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’।

আমি জানি, এই গল্প শুধু আমার নয়।

সত্তর ও আশির দশকের বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছে নামগুলো বদলে যাবে। শহর বদলে যাবে। হয়তো কারও স্মৃতিতে চুয়াডাঙ্গা নয়, বরিশাল। কারও রংপুর। কারও নোয়াখালী। কারও গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়ি। কারও বাজারের দোকান। কারও স্কুলের ঘর।

কিন্তু গল্পটা আশ্চর্য রকম একই।

একটি টেলিভিশন।

তার সামনে অনেক মানুষ।

একটি লোগো।

একটি সুর।

আর অপেক্ষা।

এমন নস্টালজিয়া নেই সত্তর আশির দশকের মানুষের মধ্যে কজনের?

এই কারণেই যারা বিটিভির লোগো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁদের কাছে আমার অনুরোধ, এটিকে শুধু একটি ডিজাইন ফাইল হিসেবে খুলবেন না।

একবার চোখ বন্ধ করুন।

ভাবুন, এই লোগোর দিকে গত অর্ধশতাব্দীতে কত কোটি চোখ তাকিয়েছে।

কত শিশু ছুটে এসেছে।

কত পরিবার একসঙ্গে বসেছে।

কত মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পর নতুন বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে এটিকে দেখেছে।

কত মানুষ আজ আর পৃথিবীতেই নেই, কিন্তু তাদের সঙ্গে কাটানো সন্ধ্যার স্মৃতিতে এই লোগোটি রয়ে গেছে।

নতুন একটি লোগো বানাতে হয়তো কয়েক দিন লাগে।

একজন দক্ষ ডিজাইনার কয়েক ঘণ্টাতেও সুন্দর কিছু বানিয়ে দিতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো কয়েক সেকেন্ডে শত নকশা দেখিয়ে দেবে।

কিন্তু একটি প্রতীকের সঙ্গে একটি জাতির অর্ধশতাব্দীর ভালোবাসা তৈরি করতে কত সময় লাগে?

পঞ্চাশ বছর?

ষাট বছর?

নাকি একটি পুরো প্রজন্মের জীবন?

সেই হিসাব কোনো সফটওয়্যার জানে না।

তাই বিটিভিকে নতুন করুন।

খুব নতুন করুন।

এমন বিটিভি তৈরি করুন, যেটা দেখে নতুন প্রজন্ম আবার টেলিভিশনের সামনে ফিরে আসে।

কিন্তু অনুরোধ একটাই।

ওই লাল সবুজটা মুছে ফেলবেন না।

কারণ ওটা শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো নয়।

ওটার মধ্যে আমার শৈশব আছে।

আমাদের প্রজন্মের শৈশব আছে।

আর একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে,

ওটার মধ্যে একটি বাংলাদেশেরও শৈশব আছে।

আলী কদর পলাশ প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক এই আমার দেশ