কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে মাঠে না থাকাকে সাংগঠনিক দুর্বলতা হিসাবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ দলের শীর্ষ মহল। শিগগিরই দল ও সহযোগী সংগঠনের কোথায় কি সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে এবং কেন তারা মাঠে নামেনি তা চিহ্নিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল পদে থেকেও যারা এ সময়ে মাঠে ছিলেন না বরং আত্মগোপনে চলে গেছেন, তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকালে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বৈঠকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলীয় সভাপতির বরাত দিয়ে এ নির্দেশনার কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি নেতাকর্মীদের ছয়টি নির্দেশনা মেনে চলার কথা বলেন। সেগুলো হলো-কারফিউ আইন ভঙ্গ না করে নেতাকর্মীদের অলিগলিতে অবস্থান নেওয়া, বহিরাগত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে থানায় তালিকা দেওয়া, আহত ও নিহত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করা, গুজব প্রতিরোধে মসজিদ ভিত্তিক কাজ করা, অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখা এবং নিজ নিজ পাড়া-মহল্লায় সমন্বয় সভা করা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য জানায়।

 

সূত্র জানায়, এবারের ঘটনায় দলের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব ফুটে উঠেছে। বৈঠকে একই সঙ্গে সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে দলের সিনিয়র নেতা, দলীয় সংসদ-সদস্য ও দলীয় কাউন্সিলর এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও ঢাকার দলীয় সংসদ-সদস্য, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, ঢাকার সিটি মেয়র, সব সহযোগী সংগঠনের ঢাকা মহানগরের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ওবায়দুল কাদের তার বক্তব্যে দলীয় সভাপতির নির্দেশনাগুলো নেতাকর্মীদের জানান। তিনি বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন, তিনি আমাদেরও চোখ-কান খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।

সভায় ওবায়দুল কাদের রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করার কথা জানান। এর মধ্যে রয়েছে-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড, উত্তরা ও গাবতলী। নগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের এসব স্থানে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কারফিউ চলার কারণে মূল সড়কে একত্রে সমাবেশ না করে প্রতিটি গলি ও মোড়ে মোড়ে অবস্থান থাকবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের।

এসব এলাকায় দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং দলীয় জনপ্রতিনিধিরা আলাদা আলাদা বৈঠক করবেন বলেও জানান ওবায়দুল কাদের। এরই অংশ হিসাবে আজ ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের দলীয় সংসদ-সদস্য এবং দল ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করবেন ওবায়দুল কাদের। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহম্মেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবিরসহ নগর আওয়ামী লীগ নেতারাও এতে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া সভায় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়েও সমালোচনা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে জেলা কমিটি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। এ সময় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ এই ছাত্র সংগঠনকে নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এদিকে আন্দোলনের সময় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত এবং আহত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির নির্দেশনার কথা জানান ওবায়দুল কাদের।

বৈঠকে উপস্থিত এক সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে জানান, নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তার চোখে যে সমস্যাগুলো পড়েছে, সেগুলো নিয়েই দলের সাধারণ সম্পাদক আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার এক সংসদ-সদস্য যুগান্তরকে বলেন, সাংগঠনিকভাবে আমাদের যেসব দুর্বলতা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠার বিষয়ে বৈঠকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের নির্দেশনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমরা সরকারি দলে থাকার কারণে সবার মধ্যেই একটা আলস্য ভাব এসে গেছে। ওরা (বিএনপি-জামায়াত) যে ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে গেছে, এটা আমরা খেয়ালই করিনি। এই বিষয়গুলো আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমাদের অ্যাকটিভ থাকতে হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তারিক সাঈদ যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি-জামায়াত-শিবির যতদিন পর্যন্ত তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর অপচেষ্টা করবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব। এ বিষয়েই বৈঠকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত কয়েক দিন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং ধানমন্ডির দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের খুব একটা ভিড় দেখা যায়নি। তবে মঙ্গলবার পুরোনো দৃশ্য ফিরেছে কার্যালয় দুটিতে। সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল থেকেই দলীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের পুরো রাস্তায় দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা ছিল না। এছাড়া এদিন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কারফিউয়ের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় দরিদ্র মানুষদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।