কিশোরীবেলা এমন এক সময় যখন শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে একসঙ্গে বহু পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এই পরিবর্তনগুলো একদিকে নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়, অন্যদিকে বিভ্রান্তি ও নিঃসঙ্গতাও বাড়িয়ে তোলে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরীদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। এখানে অন্যদের সুখী ও পরিপূর্ণ জীবন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। এই ভার্চুয়াল তুলনা তাদের নিঃসঙ্গতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, বিশ্বে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ জনগোষ্ঠী হলো কিশোরীরা। বিশ্বব্যাপী প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে নিঃসঙ্গতা অনুভব করে, আর তাদের মধ্যে ২৪.৩ শতাংশ কিশোরী।

গবেষণাটি তৈরি হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন কমিশন অন সোশ্যাল কানেকশনের আওতায়। গবেষণার উদ্দেশ্য, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কীভাবে এই নিঃসঙ্গতা তৈরি হচ্ছে এবং তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলছে, সেগুলো চিহ্নিত করা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে। বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ নিজেদের নিঃসঙ্গ মনে করে। ৩০ বছরের নিচের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই হার ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই সংখ্যা মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহসভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সার্জন জেনারেল বিবেক মার্থি বলেন, নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ক্ষতিকর। এটা শুধু সামাজিক সংকট নয়, এটি একধরনের মহামারি।

নিঃসঙ্গতা মানেই একা থাকা নয়, এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। কেউ হয়তো জনসমক্ষে থেকেও নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নিঃসঙ্গতার অনুভূতি তখন জন্ম নেয়, যখন মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মিলিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক। এর ফলে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্মৃতিভ্রম ও বিষণ্নতা পর্যন্ত হতে পারে।

বিশেষ করে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই নিঃসঙ্গতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার, বাস্তব জীবনে সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, আত্মমর্যাদার সংকট ও একাকী বেড়ে ওঠা।

নিঃসঙ্গতা আজ আর শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একে বলা হচ্ছে “অদৃশ্য মহামারি”। কিশোর-কিশোরীদের জীবনে এর প্রভাব ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করছে। মানসিক চাপ, হতাশা, এমনকি আত্মহানির প্রবণতা পর্যন্ত বাড়ছে এর কারণে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমস্যা এতটা ব্যাপক আকার নিয়েছে যে অনেক দেশই এখন এটিকে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে।

কিন্তু সুখবর হলো শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই থেমে থাকেনি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা। বিশ্বজুড়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সুস্থ সামাজিক জীবনের পথ খুঁজে বের করতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিটি দেশের সরকারকে এখন বিশেষ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে মানুষের মধ্যে সামাজিক সংযোগ জোরদার করা এবং নিঃসঙ্গতা নিরসন হবে অন্যতম লক্ষ্য। শুধু মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা নয়, বরং জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে এমন কার্যক্রম চালু করতে হবে, যা মানুষকে মানুষে কাছে নিয়ে আসবে।

কিশোর-কিশোরীদের জন্য উদ্যোগ

কৈশোর এমন সময় যখন সামাজিক দক্ষতা তৈরি হয়, কিন্তু এই বয়সেই নিঃসঙ্গতা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, টিমওয়ার্ক শেখানো এবং সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি চালু করা জরুরি। এতে করে তারা শুধু আত্মবিশ্বাসীই হবে না, বরং নিজেদের আবেগও সঠিকভাবে প্রকাশ করতে শিখবে।

কমিউনিটি এনগেজমেন্ট প্রোগ্রাম

সব বয়সের মানুষের জন্য কমিউনিটি এনগেজমেন্ট প্রোগ্রাম কার্যকর হতে পারে। শিশুদের জন্য খেলাধুলা, তরুণদের জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা প্রবীণদের জন্য সামাজিক আড্ডা—সবকিছুই হতে পারে নিঃসঙ্গতা নিরসনের উপায়। সামাজিক কার্যক্রম মানুষকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে, আর এই সংযোগই হলো মানসিক সুস্থতার শক্তিশালী ভরসা।

সুইডেনের দৃষ্টান্ত

বিশ্বের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সুইডেনের উদ্যোগ। তারা চলতি বছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে শুধু নিঃসঙ্গতা মোকাবিলার জন্য। এর মধ্যে অন্যতম হলো—

প্রবীণ নাগরিকদের জন্য “সোশ্যাল রিচিং প্রোগ্রাম”, যেখানে তাদের একা না রেখে সমাজের সক্রিয় অংশ হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে।

১৬–১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য “অ্যাকটিভিটি কার্ড” দেওয়া হচ্ছে। এই কার্ড ব্যবহার করে তারা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা যে কোনো সামাজিক ইভেন্টে অংশ নিতে পারবে। তবে শর্ত একটাই এই কার্যক্রমে যেন তাদের নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ার সুযোগ থাকে।

নিঃসঙ্গতাকে কেবল একটি ক্ষণিকের আবেগ মনে করলে ভুল হবে। বরং এটিকে দেখতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার প্রশ্ন হিসেবে।