• ট্রানজিট পারমিট থেকে বন সৃজন সবখানেই অর্থ লোপাট
  • কাগজে সবুজ বন, বাস্তবে ফাঁকা মাঠ
  • ডিএফও’র নাম ব্যবহার করে মাসিক লক্ষ লক্ষ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
  • অবৈধ করাতকল থেকে মাসিক ‘মাসোহারা’
  • সরকারি বন উজাড় ও গাছ পাচারের ভয়াবহ চিত্র
  • নীরব প্রশাসন, প্রশ্নবিদ্ধ জবাবদিহিতা

যশোর সামাজিক বন বিভাগ যেন এখন আর বন সংরক্ষণের দপ্তর নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে এমনই অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির একাধিক কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ঘিরে। অনুসন্ধানে জানা যায়, যশোর সদরের ডেপুটি রেঞ্জার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বন, প্রকল্প ও রাজস্ব খাতকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছে। যশোর সামাজিক বন বিভাগের আওতাধীন প্রতিটি রেঞ্জ অফিস থেকে মাসিক ট্রানজিট পারমিট বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব টাকা কাগজে-কলমে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অনিতা মন্ডলের নামে উত্তোলন দেখানো হলেও বাস্তবে সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টন করছেন ডেপুটি রেঞ্জার মিজানুর রহমান এমন অভিযোগ একাধিক সূত্রের।

ব্যবসায়ীদের দাবি, নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাঠবোঝাই ট্রাক আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। কার্যত ট্রানজিট পারমিটকে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক বন বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ করাতকলগুলোও এই সিন্ডিকেটের নিয়মিত আয়ের উৎস বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অনুমোদনহীন করাতকলগুলো থেকে মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। বিনিময়ে এসব করাতকলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালানো হয় না। জেলা পরিষদসহ সরকারের বিভিন্ন বনের গাছ পাচারের অভিযোগ আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। সূত্রের দাবি, কিছু ফরেস্টার ও মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের সঙ্গে আতাত করে সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। পাচার হওয়া গাছের একটি বড় অংশ যায় ব্যক্তিগত করাতকল ও কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন ভাগ করে নেওয়া হয়।

সরকারি বন সৃজন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ সবচেয়ে ভয়ংকর। বন সৃজনের নামে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় বন সৃজনের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোথাও কোথাও নামমাত্র কয়েকটি চারা রোপণ করে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের ভুয়া কাগজ তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষার নামে বরাদ্দকৃত অর্থ যে কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হচ্ছে, এই প্রকল্পগুলো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়াও, সরকারি বিভিন্ন দিবস পালন, সভা-সেমিনার ও আপ্যায়ন খরচের নামেও নিয়মিত অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। বাস্তবে স্বল্প পরিসরের আয়োজন হলেও কাগজে-কলমে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। গাছ বিক্রির টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও রয়েছে ভয়াবহ অনিয়ম। টেন্ডার থেকে কমিশন আদায়ের পাশাপাশি টেন্ডার বর্হিভূত গাছ কর্তন করে বিক্রি করা হচ্ছে দেদারছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো ছোট গাছের টেন্ডার দেখিয়ে বড় ও মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি বন আইনের লঙ্ঘন। এতসব অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন মহলের নীরবতা প্রশ্ন তুলছে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়েও। পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, অবিলম্বে স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন না হলে যশোরের সামাজিক বন বিভাগ থেকে বন নয়, কেবল দুর্নীতির চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে।

এ বিষয়ে যশোরের ডেপুটি রেঞ্জার মিজানুর রহমানের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, ট্রানজিট পাশ নিয়ম মোতাবেক সম্পূর্ণ ফ্রি দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ কেউ কিছু কিছু টাকা নিয়ে থাকেন। বিভিন্ন দিবস ও আপ্যায়নের খরচ বাবদ সরকারি কোন বরাদ্দ নেই বিধায় অন্যান্য খাত থেকে টাকা সমন্বয় করতে হয়। ট্রানজিট পারমিট থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এছাড়াও বিভিন্ন রেঞ্জ অফিস থেকে ডিএফও অনিতা মন্ডল’র নামে মাসিক টাকা উত্তেলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আমতা আমতা করতে থাকেন, কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। 

এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অনিতা মন্ডলের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: দৈনিক বিডি খবর