শোরের মনিরামপুর রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য জননেতা তরিকুল ইসলামের আজীবন সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ঠ সহচর আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছা আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

শনিবার ভোররাত আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে যশোর কুইন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন তিনি।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছা ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার পরপরই মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং নেতৃত্বগুণে দ্রুতই তিনি তৃণমূল রাজনীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। টানা ১২ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তী ১২ বছর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তার নেতৃত্বে মনিরামপুর বিএনপি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে এবং উপজেলা পর্যায়ে একটি সুসংগঠিত ও আদর্শিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

শুধু রাজনৈতিক সংগঠকই নন, জনপ্রতিনিধি হিসেবেও আলহাজ্ব মুছার রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। আশির দশকে তিনি মনিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি তিন দফা ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং প্রতিটি সময়েই জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন।

স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁর উদ্যোগ ও নিরলস পরিশ্রম আজও এলাকাবাসীর স্মৃতিতে অমলিন।

আলহাজ্ব মুছা ছিলেন এক সংগ্রামী, সৎ ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ, যার জীবনে পদ-পদবি বা ক্ষমতার মোহ কখনোই দেখা যায়নি। দুর্নীতিমুক্ত জীবনযাপন এবং জনগণের সঙ্গে মাটির টানই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি।

দলীয় আদর্শে অবিচল থেকে তিনি একাধিকবার রাজনৈতিক হয়রানি, মিথ্যা মামলা এবং কারাবরণের শিকার হন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক মামলা হয়, গ্রেফতারও হন কয়েকবার।

তাঁর ছোট ভাই ১৯৯০ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন এবং পরিবারকেও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা হয়। তবুও কোনো দিন তিনি নীতি ও দলের আদর্শ থেকে সরে যাননি।

মনিরামপুরে তৃণমূল বিএনপি কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মুছা ভাই’ নামে পরিচিত এক নির্ভরতার নাম। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরা তাঁকে দেখতেন একজন আদর্শিক পথপ্রদর্শক হিসেবে। তিনি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, ছিলেন একজন অভিভাবক, সংগঠক এবং গঠনমূলক পরামর্শদাতা।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছার মৃত্যুতে শুধু বিএনপি নয়, মনিরামপুরসহ যশোরের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপির স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন—

 “মুছা ভাইয়ের মৃত্যুতে আমরা একজন প্রকৃত জাতীয়তাবাদী আদর্শের সৈনিককে হারালাম। তিনি ছিলেন রাজনীতির নির্লোভ যোদ্ধা, যার মতো মানুষ আজকের দিনে বিরল।”

 

তাঁর অবদান স্মরণ করে অনেকে বলেন, “আজ রাজনীতিতে আদর্শ, ত্যাগ ও সততার অভাব যখন সর্বত্র, তখন মুছা ভাইয়ের জীবন ছিল আমাদের জন্য জীবন্ত অনুপ্রেরণা।”

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মরহুম আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছার জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরবর্তীতে জানানো হবে। পারিবারিক কবরস্থানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুছা ছিলেন রাজনীতির মাঠের এক নিঃস্বার্থ, আদর্শিক সৈনিক। তাঁর প্রয়াণে একটি অধ্যায়ের অবসান হলেও তাঁর আদর্শ ও ত্যাগ আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।